ভাব বিনিময় করে কি প্রাণীরা
প্রাণীরা কি একে অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে? এই ধরা যাক কিছু কাজের কথা। যেমন, কোথায় খাবার পাওয়া যাবে, পরজীবিদের শায়েস্তা করা যায় কী ভাবে, বিপদ থেকে বাঁচার উপায় আছে নাকি কিছু?
বিজ্ঞানীরা
এত দিন মনে করতেন যে, একই প্রজাতির প্রাণীরা নিজেদের মধ্যে ভাব আদান-প্রদান করে থাকে।
কুকুর কুকুরের সঙ্গে। বেড়াল বেড়ালের সঙ্গে। হাতি আর পাঁচটা হাতির সঙ্গে। প্যাঁচা প্যাঁচানীর
সঙ্গে। তাঁরা এখন বলছেন, না। সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর
মধ্যেও আলাপ-আলোচনা হয়ে থাকে, তাদের নিজস্ব ভাষায়। যেমন, বক আর কুমিরের মধ্যে, বা বেজি আর বুনো শুয়োরের মধ্যে। এমন কী
মানুষের সঙ্গে পোষ্য ও বন্য প্রাণীরও। এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে
নিজেদের ভাষায় এই ভাব বিনিময়, প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এমনটাই
অভিমত বিজ্ঞানীদের।
আফ্রিকায় এক প্রজাতির পাখি আছে যারা মৌলেদের সঙ্গে কথা বলে। যখনই তারা মধু-ভরা
মৌচাকের সন্ধান পায়, তখনই গ্রামের কাছে উড়ে এসে এক বিশেষ স্বরে ডাকতে থাকে। সেই ডাকের
মানে গ্রামবাসীরা বোঝেন। মৌচাকের সন্ধান পেয়েছে পাখিরা। ওরা উড়তে উড়তে পথ দেখিয়ে
নিয়ে যায় মধুকরদের। চাক ভাঙা হলে মধুকরেরা পায় মধু আর পাখিরা মৌচাকের মোম। সেটা
তাদের খুব প্রিয় খাবার। এমনি করেই পাখি ও মানুষের মধ্যে চলে এক যৌথ উদ্যোগ।
গবেষকরা
দেখেছেন, আফ্রিকায়
বিরাট আকৃতির বন্য শুয়োর—ওয়ার্টহগ— ও বেজির মধ্যেও একটা বোঝাপড়া আছে। ওই
শুওরেরা একটা বিশেষ ভঙ্গিতে বসলে, বেজিরা গুটিগুটি তাদের কাছে আসে। ওরা শুয়োরটির গা থেকে এক এক করে পরজীবী পোকাদের
খেয়ে নেয়। ফলে ওয়ার্টহগটি স্বস্তি পায়, আর বেজিরা খাবার। বেজিরা নিরাপত্তাও
পায়। ওয়ার্টহগের চেহারাটা দশাসই। মেজাজটাও তিরিক্কে। তাই ওদের কেউ ঘাঁটয় না।
বেজিরা ওয়ার্টহগের আশেপাশে ঘুর ঘুর করলে, নিরাপদে থাকে। এক্ষেত্রে ভাব বিনিময়ের
ভাষাটা হল, ওয়ার্টহগের
বসার বিশেষ ভঙ্গি।
গবেষকরা
দেখেছেন, বিভিন্ন
প্রজাতির প্রাণী নানা ভাবে ভাব প্রকাশ করে। বিশেষ ডাক, নির্দিষ্ট আচরণ, অঙ্গভঙ্গি, ও আরও অনেক ইঙ্গিত তারা ব্যবহার করে
অন্যদের কিছু একটা বোঝাতে। যেমন, সমুদ্রে এক ধরনের মাছ ও চিংড়ি যখন উজ্জ্বল রং ধারণ করে শরীরে ও বিশেষ
এক ভঙ্গিতে দুলতে থাকে জলে, তারা অন্য শিকারি মাছদের একটা বার্তা দেয়। বলে, আমরা এখন তোমাদের পরিষ্কার করব।
শিকারিরা তখন শান্ত হয়ে নিজেদের শরীর পরিষ্কার করায়। মানে, তাদের গায়ে লেগে থাকা পরজীবীরা চলে যায়
অন্যের পেটে।
কুমির
সঙ্গে বকের মিশরের প্লোভার পাখির মৌ বা ‘মেমোর্যান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যাডিং’ তো সাক্ষরীত হয়েছে অনেক কাল আগে। শীতের
দুপুরে, নদীর
ধারে বালিতে বসে কুমির যখন তার বিরাট মুখটা হাঁ করে তার ভয়ংকর দাঁতের সারি বার করে
দেয়, তখন
প্লোভার এসে তা পরিষ্কার করে। কুমির দাঁতের
ফাঁকে আটকে থাকা খাবারের টুকর তারা তুলে তুলে খায়। কিন্তু কখন তারা দাঁত
সাফাই করতে চায়, হাবে
ভাবে তা বুঝিয়ে দেয় কুমির। প্লোভাররাও বুঝে নেয়।
আবার
এও দেখা গেছে, এক
ধরনের প্রজাপতির শুঁয়োপোকা এমন এক রাসায়নিক পদার্থ ছড়াতে থাকে ও শরীরে কম্পন
সৃষ্টি করে যা এক প্রজাতির পিঁপড়েদের আকর্ষণ করে নিজেদের চারপাশে। ওই পিঁপড়েদের
উপস্থিতি ওদের নিরাপত্তা দেয়। শত্রুরা আর ধারে কাছে আসে না।
যাঁরা
সমুদ্রে মাছ ধরেন, তাঁদের সঙ্গে শুশুকদের সম্পর্ক অনেক দিনের। শুশুকরা তাঁদের বলে দেয়
কোথায় মাছ আছে, কখন
জাল ফেলতে হবে। শুশুকদের আচরণ, তাদের চলাফেরা, দেখে মৎস্যজীবীরা বুঝে নেন তারা কী ইঙ্গিত করছে। জালে মাছ ধরা পড়লে
শুশুকরাও তার ভাগ পায়। যৌথ উদ্যোগ। খবরের বিনিময়ে খাবার।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন