অন্ধকারকে মানুষ ভয় পায় কেন
ছোটোবেলায় অন্ধকার ঘরে, বাড়ির দালানে বা অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনও রাস্তায় যেতে গা ছমছম করে। তারপর বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারকে ভয় পাওয়ার যে অনুভূতি ছোটোবেলায় চেপে বসে, তা কেটে যেতে থাকে। তবুও প্রাপ্তবয়স্করাও অন্ধকার পছন্দ করেন না। আমরা যতক্ষণ জেগে থাকি, ততক্ষণ আমাদের আলো প্রয়োজন হয়—জোরালো হোক বা স্তিমিত।
মানুষ অন্ধকারকে ভয় পায় কেন?
মনে করা হয়, অন্ধকারে মানুষ কিছু দেখতে পায় না বলেই তাকে ভয় পায়। চাঁদনি রাতে যদিও বা চারপাশের দৃশ্যের এক মায়াবী আবছায়া আমাদের চোখে ধরা পড়ে, নিকষ কালো অমাবস্যার রাতে হাতের কাছের বস্তুটিকেও তো আমরা ঠাওর করে উঠতে পারি না।
গবেষণায় দেখা গেছে, বড় বয়সেও অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করলে বা হঠাৎ আলো নিভে গেলে আমাদের শরীরে কিছু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হতে শুরু করে, যার ওপর আমাদের সচেতন সত্তার কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমাদের অজান্তেই বুকের পেশিগুলি টানটান হয়ে ওঠে, চোখের মণি বড় হয়ে যায়, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বাড়ে।
এসব ঘটে যাওয়ার পরই আমাদের সচেতনতা তার কাজ শুরু করে। যুক্তির ঢাল দিয়ে আচমকা তৈরি হওয়া মনের অস্বস্তিকে প্রতিহত করে। অন্ধকারের বেষ্টনী ভাঙতে আমরা আলো জ্বালাই বা আলোর উৎসের সন্ধান করি।
গবেষকরা মনে করেন, আমাদের শরীরে যে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিত্ব বা স্নায়ুচাপের কোনও সম্পর্ক নেই। যা ঘটে, তা হলো অন্ধকারের অনিশ্চয়তার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য শরীরকে প্রস্তুত করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র।
আমাদের শরীরকেই বা প্রস্তুত হতে হয় কেন? কুকুর-বিড়াল তো অন্ধকারের বিশেষ তোয়াক্কা করে বলে মনে হয় না। অনেক প্রাণী তো অন্ধকার হলেই কাজে বেরোয়। পেঁচারা তো ইঁদুর রাতেই ভালো ধরে। আসলে মনে করা হয়, ওই প্রস্তুতি-পর্বটি মানুষকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই অন্ধকারে প্রবেশ করা মাত্রই চালু হয়ে যায়। আর এই ব্যবস্থা বহাল আছে প্রায় ১০ লক্ষ বছর ধরে।
আধুনিক মানুষ বা ‘হোমো সেপিয়েন্স’-এর সুদূর পূর্বপুরুষ ’হোমো ইরেক্টাস’রাই নাকি প্রথম আগুন জ্বালাতে শিখেছিল। আর সেকালে আগুনই ছিল রাতের অন্ধকার দূর করার একমাত্র আলোর উৎস। রাত ছিল ভয়ের সময়। কোথায় ওৎ পেতে আছে শত্রু, ঘোর অন্ধকারে তা বোঝার কোনও উপায় ছিল না। সাপ, বিছে, মশা, বাদুড়, চামচিকে—কে কখন অন্ধকারে গায়ের ওপর এসে পড়ে, তার ঠিক নেই। খ্যাঁকশেয়াল, খটাশ, বনবেড়াল, বাঘ, চিতাবাঘ, সিংহ, হায়না, হাতি, গণ্ডার—কে কখন কামড় বসায় বা পা দিয়ে পিষে চলে যায়, কে বলতে পারে! রাতজুড়ে তাই মনের মধ্যে জমে থাকত আতঙ্ক। হোমো ইরেক্টাস যেদিন হোমো সেপিয়েন্সে রূপান্তরিত হলো, তখন জিনের মাধ্যমে আধুনিক মানুষের মধ্যেও প্রবাহিত হলো সেই অন্ধকারের ভীতি, সেই সঙ্গে তার মোকাবিলা করার শারীরিক প্রতিক্রিয়াও।
মনস্তত্ত্ববিদ মার্টিন সেলিগম্যান ১৯৭১ সালে ‘সাইকোলজিক্যাল রিভিউ’ জার্নালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্রে বলেন, জন্মের পর বেড়ে ওঠার সময় থেকেই কিছু কিছু জিনিস সম্পর্কে মানুষের মনে ভয় তৈরি হতে শুরু করে। সেগুলি-সংক্রান্ত একটি মাত্র অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা থাকলেও সেই ভয় সঞ্চারিত হতে থাকে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অন্ধকার, উচ্চতা, সাপ, মাকড়সা, বিছে, আরশোলা, টিকটিকি ইত্যাদি। দেখা গেছে, এই ভীতি যুক্তির সাহায্যে কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। মনের ওই প্রতিক্রিয়াকে সেলিগম্যান বলেছেন, “দশ লক্ষ বছর ধরে বেঁচে থাকার সার্কিট”।
ফোর্বস ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কেন এমনটা হয়, তা জানার চেষ্টা করেছেন স্নায়ুবিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলেছেন, মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে একটি ছোট্ট অংশ আছে—অ্যামিগডালা। কোনও রকম বিপদের আভাস পেলেই এই অংশটি মস্তিষ্কের বিচার-বিবেচনার কেন্দ্রকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজেই শরীরকে বিপদ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করে। বিপদের আভাস বা সংকেত চোখ দিয়েই আসুক বা ত্বক থেকে, অ্যামিগডালা তার প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করে। মস্তিষ্কের অন্যান্য বিভাগ কাজ শুরু করে তার পরে।
ছবি: নিজস্ব

Comments
Post a Comment