সজীব, সবুজ, সে অন্য এক সাহারা
আফ্রিকার
দেশ আলজেরিয়া। আলজেরিয়াই আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ। এবং সে দেশেই আছে আফ্রিকার সব চেয়ে
বড়ো জাতীয় উদ্যান, তাস্সিলি নাজ্জের। আলজেরিয়ার দক্ষিণ ভাগ জুড়ে রয়েছে সাহারা মরুভূমি।
ওই জাতীয় উদ্যান ছড়িয়ে আছে সাহারার একটা অংশ জুড়ে।
এই
উদ্যানের বৈশিষ্ট্য হল, এখানে আছে প্রকান্ড সব বালি-পাথরের চাঁই। যার অনেকগুলোই টিলার মতো বড়। প্রকৃতির এই অদ্ভুত সৃষ্টি সেখানকার
এক বড় আকর্ষণ। তবে অনেকে বলেন, দূরদূরান্তে ছড়ানো ওই টিলাগুলি হল বিশ্বের বৃহত্তম আর্ট মিউজিয়ামের
প্রদর্শনী গ্যালারি। কারণ, পাথরের চাঁইগুলির দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা আছে অজস্র ছবি।
প্রায়
১৫,০০০ প্রাচীন, প্রাগৈতিহাসিক সব দেওয়াল চিত্র রয়েছে
সেখানে। বেশ কিছু প্রায় ১১,০০০ বছর পুরোনো। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বয়স মাপার প্রযুক্তি ব্যবহার করে
তেমনটাই জানা গেছে।
তবে
ছবিগুলিতে সে কালের মানুষ যা এঁকে ছিলেন, তার সঙ্গে আজকের মরুপ্রান্তেরের কোনও
মিল নেই। বরং ছবিতে দেখা যাচ্ছে সাভানা ঘাসের বিস্তার। বিচরণরত হাতি, জিরাফ, গন্ডার, জলহস্তী। আজকের রুক্ষ, শুষ্ক তাস্সিলি নাজ্জের-এর তপ্ত
বালিয়াড়ির সঙ্গে অতীতের ওই দৃশ্য যেন অন্য কোনও জায়গার। গবেষকরা বলছেন, আঁকা ছবিতে যেমনটা দেখা যাচ্ছে, তেমনটাই ছিল সে কালের সহারা অঞ্চলের
চেহারা, বলা
হচ্ছে, ১১,০০০ থেকে ৬,০০০ বছর আগে পর্যন্ত সাহরা ছিল সবুজ। বড় বড় প্রাণীর বাসভূমি।
সেই
সময় সাহারা অঞ্চলের আবহাওয়া ছিল আর্দ্র। সেই স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে, সেখানে বিস্তৃত ছিল জঙ্গল ও তৃণভূমি।
ছিল হ্রদ ও নদীও। কখনও সবুজ, কখনও ধূসর — তেমনই পরিবর্তন নাকি একবার নয়, বার বার ঘটেছে সাহারা অঞ্চলে। গবেষকরা
বলছেন, ৮০
লক্ষ বছরে ২৩০ বার। দেখা গেছে, প্রতি ২১ হাজার বছরের কিছু আগে পরে এমন পরিবর্তন দেখা গেছে অতীতে।
কেন
২১ হাজার বছর অন্তর এমনটা বার বার ঘটেছে? এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীরা অনেক দিন
ধরেই খুঁজেছেন, কিন্তু
সঠিক কারণটা জানা জানা যায়নি। সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি ইউনিভার্সিটির
গবেষক এডওয়ার্ড আর্মস্ট্রং বলেছেন, আধুনিকতম প্রযুক্তি ও কমপিউটারের
সাহায্যে তাঁরা জেনেছেন যে, পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর ঘুরতে ঘুরতে, প্রতি ২১ হাজার বছর অন্তর একটু টাল
খায়। তার ফলে, আবহাওয়ার
পরিবর্তন ঘটে। বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়। বৃষ্টি পড়ে। প্রকৃতি সবুজ রূপে সাজে।
বড়ো বড়ো প্রাণীদের আবির্ভাব হয়।
আর্মস্ট্রং
বলেছেন, অতীতে
আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটত প্রাকৃতিক কারণে। এখন তা ঘটছে মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাবের
ফলে। আগামী দিনেও, উষ্ণায়নের সঙ্গে সঙ্গে, সাহারার প্রকৃতি বদলে যেতে পারে, যা সারা বিশ্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে
বলে মনে করছেন গবেষক।
এদিকে
সাহারাতে তো বৃষ্টিপাত ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। সাহারা অঞ্চলে বৃষ্টি পড়ে না এমন
নয়। তবে তা যৎসামান্য, বছরে কয়েক ইঞ্চি মাত্র। অথচ, ২০২৪ সালের ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর, সেখানে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ে, যা মরক্কো, আলজেরিয়া, লিবিয়া ও তুনিসিয়ার মতো দেশের বহুকালের
রুক্ষ মাটিকে জলে ডুবিয়ে দেয়, বলেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা। এমন কী যে সব হ্রদের মতো
জায়গায় কোনও দিন জল ছিল না, সেগুলিও ভরে উঠে জলাশয় সৃষ্টি হয়। অথচ, নাসা জানিয়েছে যে, ওই সব দেশে বৃষ্টি হয় না বললেই চলে।
এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি
অফ শিকাগো’র
গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দশকে সাহারায় নাটকীয় পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। অতীতের গড়
বৃষ্টিপাতের চেয়ে সেখানে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ছবি: উইকিপিডিয়া কমন্স

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন