ঘাম আমাদের ঝরাতেই হবে

 




যৌবনের সীমানা ছাড়িয়ে যদি আমাদের সুস্থ-সবল থাকতে হয়, তা হলে ঘাম আমাদের ঝরাতেই হবে

এই কথা যিনি বলেছেন তিনি একজন নামকরা বিজ্ঞানী ডেভিড এ সিংক্লেয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল-এর সঙ্গে যুক্ত টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের নির্বাচিত ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন তাঁর লেখা বইলাইফস্প্যানএকটি বেস্টসেলার সেই বইয়ের এক জায়গায় উনি লিখেছেন যে, বয়স বাড়ার গতি কমাতে ও আসন্ন বার্ধক্যকে সহনশীল করে তোলার জন্য ব্যায়াম আমাদের করতেই হবে

কেন করতে হবে?

ব্যায়াম করলে আমাদের শরীরে কী কী পরিবর্তন ঘটে তার একটা বিবরণ দিয়েছেন অধ্যাপক সিংক্লেয়ার এবং সেই সব প্রক্রিয়া, নানা ধরনের বাড়া-কমা, বয়সের প্রভাবকে কমিয়ে দেয় উনি মনে করেন বার্ধক্য একটা অসুখ ও তা চিকিৎসাযোগ্য এবং সেই চিকিৎসার ওষুধ হল ব্যায়াম

উনি লিখেছেন যে, আবহমান কাল থেকে জীবনীশক্তি ধরে রাখার জন্য ব্যায়াম করার পরামর্শই দেওয়া হয়ে আসছে এই পরামর্শ যেন এক প্রেক্রিপশনের সমতুল্য কিন্তু তার কারণটা অনেকেইএমনকি ডাক্তারওজানেন না

প্রায় চারশো বছর আগে, ইংরেজ চিকিৎসক উইলিয়াম হার্ভে আবিষ্কার করেন যে, মানুষের শরীরে রক্ত নানা আকৃতির নলের এক বিস্তৃত জালের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয় সেই থেকে চিকিৎসকরা মনে করে আসছেন যে, ব্যায়াম করলে, সঞ্চালন ব্যবস্থা রক্ত চলাচলের গতি বাড়ে তার ফলে, রক্তনালিতে জমে ওঠা প্লাক বা আস্তরণ পরিষ্কার হয়ে যায় ও শরীর চাঙ্গা থাকে

কিন্তু কাজটা ঠিক এই ভাবে হয় না, বলেছেন অধ্যাপক সিংক্লেয়ার

ঠিকই যে ব্যায়াম রক্ত চলাচলের উন্নতি ঘটায় ঠিকই যে, ব্যায়াম ফুসফুস ও হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখে আমাদের পেশীগুলিকে বড়ো ও আরও শক্তিশালী করে তোলে কিন্তু এই সবের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, খুব ক্ষুদ্র আকারে আমাদের কো-পর্যায়ে যা ঘটে যায়

গবেষকরা যখন কয়েক হাজার, কম-বেশি ব্যায়াম-করা ব্যক্তির `টেলোমেয়রসনিয়ে গবেষণা করছিলেন, তখন অনেকের মধ্যেই তাঁরা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেন দেখেন, যাঁরা বেশি ব্যায়াম করেন তাঁদের টেলোমেয়রস অন্যদের তুলনায় বেশি লম্বা

আমাদের প্রতিটি কোষের মধ্যে যে ক্রোমোজোম আছে সেগুলির ডগায় থাকে টেলোমেয়রস জুতোর ফিতের ডগা যেমন প্লাস্টিক বা ধাতুর পাত দিয়ে মোড়া থাকে, অনেকটা সেই রকম ক্রোমোজোমের মুখ যাতে ছেত্ৰে না যায় সে জন্যই প্রকৃতির এই বান্দোবস্ত

আমাদের কোষগুলি ক্রমাগত ভাগ হতে থাকে একটা ভেঙে তৈরি হয় নতুন এক কোষ সেই নতুনটিতেও থাকে ক্রোমোজোম, অবিকল আগেরটির মতই তবে প্রায় অবিকল বলাই ভাল কারণ, যতবার একটি কোষ ভেঙে নতুন একটি কোষ সৃষ্টি হয়, ততবারই ক্রোমোজোমের ডগায় লাগানো টেলোমেয়রসের আয়তন ছোট হতে থাকে এবং ছোট হতে হতে এমন একটা সময় আসে, যখন ওই কোষটির বিভাজন আর সম্ভব হয় না ফলে নতুন কোষের জন্ম না দিয়েই মারা যায় সেটি আমাদের শরীরে একটি কোষ কমে যায় এমনি করেই লক্ষ লক্ষ নতুন কোষ জন্মায় ও লক্ষ লক্ষ কোষ মারা যায় প্রতি দিন কিন্তু যদি নতুন কোষের জন্মের হার কমে যায়, তাহলেই আমাদের শরীর তার জেল্লা হারায়, ভাঙতে থাকে বার্ধক্যের ছাপ পড়তে শুরু করে চোখেমুখে অসুখ ও জরা আমাদের গ্রাস করে এবং এ সবের পেছনে থাকে ওই টেলোমেয়রসের সঙ্কুচন, সেই একটু একটু করে ছোট হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল-এর আর্থিক সাহায্য-প্রাপ্ত এক গবেষণায় দেখা যায়, যাঁরা বেশি শারীরিক কসরৎ করেনযা সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রতিদিন আধঘন্টা জগিংয়ের সমতুল্যতাঁদের টেলোমেয়রসের চেহারা ও যাঁরা তুলনায় নিষ্ক্রিয় জীবন কাটান তাঁদের টেলোমেয়রসের চেহারার মধ্যে প্রায় দশ বছরের তফাৎ লক্ষ করা যায় অর্থাৎ, যাঁরা ব্যয়াম বেশি করেন, তাঁদের টেলোমেয়রসের বয়স যেন দশ বছর কম

কিন্তু ব্যয়াম কী করে কোষের মধ্যে সাজানো ক্রোমোজমের টেলোমেয়রসগুলির সঙ্কোচনের হার কমিয়ে দেয়?

অধ্যাপক সিংক্লেয়ার লিখেছেন, আমাদের বেঁচে থাকার সময়কাল নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের কিছু জীবনদায়ী জিন এবং সেই কথাটা মনে রাখলে, বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে উনি মনে করেন খাওয়া কমিয়ে দিলে ও খাদ্যের মধ্যে জরুরি অ্যমিনো অ্যাসিডের পরিমাণ হ্রাস পেলে, ওই জীবনদায়ী জিন আমাদের কোষগুলিকে এক নির্দেশ দেয় বলে, সারভাইভাল মোডে চলে যাওয়ার কথা অর্থাৎ, শ্রেফ বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু প্রয়োজন কেবল সেটুকুই করার ব্যবস্থা নাও কোনও বিলাসিতার অবকাশ নেই আমাদের কোষগুলি তখন এক স্ট্রেস বা চাপের পরিস্থিতির সঙ্গে যোঝার জন্য প্রস্তুত হয়

ব্যয়ামও ঠিক একই কাজ করেচাপ সৃষ্টি করে শরীরে ব্যায়ামের ফলে কোষে এনএডি (NAD, Nicotinamide Adenine Dinucleotide) নামক একটি কোএনজাইমের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। তার প্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে শরীরের জীবনদায়ী নেটওয়ার্ক তার ফলে, শরীরে এনার্জি বা শক্তি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় যা পেশীগুলিকে আরও অক্সিজেনবাহী রক্তনালী সৃষ্টি করতে বাধ্য করে ব্যায়ামের দরুণ শরীরে যে চাপ সৃষ্টি হয়, তার মোকাবিলা করতে সমস্ত জীবনদায়ী ব্যবস্থা এক সঙ্গে একই লক্ষ্যে কাজ করতে শুরু করে ফলে তৈরি হয় নতুন রক্তবাহী শিরা, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের স্বাস্থ্য ভাল হয়, বৃদ্ধি পায় শারীরিক শক্তি ও টেলোমিয়েরসগুলির দৈর্ঘ্যবজায় থাকে এবং সেগুলির মান যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে, সেই ব্যবস্থা করে দুটি জিনএসআইআরটি-১ ও এসআইআরটি- (SIRT-1; SIRT-6) তাই নতুন কোষ সৃষ্টি অনেটাই বজায় থাকে সময়ের হিসেবে বয়স বাড়লেও, বার্ধক্যের বিস্তার রোধ করা যায় 

সেই কারণেই অধ্যাপক সিংক্লেয়ার বলেছেন, ব্যায়ামের কোনও বিকল্প নেই

সূত্র: লাইফস্প্যান; ডেভিড এ সিংক্লেয়ার




     

 

 

       

 

                             

     

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভালো হরমোন বাড়ায় কুকুর, বেড়াল

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস