গাছেরা কি মনে রাখতে পারে

 


অতীতের কথা কি
মনে রাখেগাছেরা? যেমন, ধরা যাক, কয়েক বছর আগের কোনও এক অনাবৃষ্টির সময়ের কথা। সেই লাগাতার শুষ্ক দিনগুলিতে কী ভাবে বেঁচে ছিল তারা? কী কৌশলে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও, তারা ধরে রাখতে পেরেছিল নিজেদের জীবনী শক্তি? তাদের স্মৃতিশক্তিতে কি গচ্ছিত থাকে সেই সব দিনের অভিজ্ঞতার কথা?

গাছেদের তেমন স্মৃতিশক্তি আছে কি নেই, তা জানতে গবেষণা চালান জার্মানির মিউনিখ
ইউনিভার্সিটি গবেষকরা
। দেখা যায়
, অভিজ্ঞতার প্রভাব পড়ে গাছেদের ওপর। অন্তত, জার্মানির স্প্রুস ও সুইজারল্যান্ডের পাইন গাছেদের ক্ষেত্রে তেমনটাই দেখা যায়। যে সব স্প্রুস গাছ এক বার জলাভাবের মধ্যে দিয়ে গেছে, ভবিষ্যতে আবার খরা হলে, সেই অনাবৃষ্টির সঙ্গে জুঝতে পারার কৌশল তারা আয়ত্ত করে নেয়।

আসলে, যে দিনকাল আসছে, তা গাছেদের পক্ষে মোটেই ভাল হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। এই উষ্ণায়নের যুগে, কোথাও খরার দিনগুলি বাড়বে, কোথাও টানা চলবে অতিবর্ষণ। প্রকৃতির ওই আচরণ বদলের সঙ্গে গাছেরা মানিয়ে নিতে পারবে তো?

উত্তরটার জন্য বিজ্ঞানীরা বেছে নেন জার্মানির এক স্প্রুস গাছের জঙ্গল। সেখানে বৃষ্টি পড়ে সময় মতো। জলের কোনও অভাব নেই। গাছেদের আকার আকৃতিও তাই ভাল। এবার, ২০১৪ সালে, কিছু গাছের জন্য কৃত্রিম খরা তৈরি করার ব্যবস্থা করলেন তাঁরা। বৃষ্টির জল যাতে সেই গাছগুলির কাছে কোনও মতেই পৌঁছতে পারে, তা নিশ্চিত করা হল। ফলে, বৃষ্টি পড়লেও সেই কিছু গাছ বৃষ্টির জল থেকে বঞ্চিত হল। তাদের জন্য তৈরি হল কৃত্রিম অনাবৃষ্টি বা খরা পরিস্থিতি। টানা পাঁচ বছর গাছগুলিকে রাখা হল তার মধ্যে।

ওই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও গাছগুলি বেঁচে থাকে। টিকে থাকার জন্য তারা নিজেদের শরীরে নানা রদবদল ঘটায়, যাতে জলের চাহিদা কমে। বিজ্ঞানীর দেখেন, গাছগুলি তাদের শেকড় ছোট করে ফেলেছে। অর্থাৎ, মাটি থেকে যথেষ্ট পরিমাণ জল টানার চেষ্টা ত্যাগ করে তারা। তারা বোঝে যে মাটিতে জল নেই তেমন। স্প্রুস গাছে পাতার আকারটা হয় খুব শরু ও লম্বা। দেখতে হয় অনেকটা ছুঁচের মতো। তাই সেগুলিকে বলা হয় নিড্ল। দেখা যায়, খরাক্লিষ্ট গাছগুলি প্রচুর পাতা ঝরিয়ে দিয়েছে। বসন্ত এলে নতুন পাতা গজায়। কিন্তু জলের অভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, নতুন পাতার সংখ্যাও কমিয়ে আনে তারা। কারণ, পাতায় থাকে অতি ক্ষুদ্র সব ফুটো (স্টোমাটা), যার মাধ্যমে তারা নিজেদের শরীর থেকে জলের বাষ্প বাতাসে ছাড়ায়। কিন্তু জলের জোগানই যেখানে কম, সেখানে বাতাসে বাষ্প বিতরণ করাটা বাতুলতা মাত্র। বাঁচার জন্য, যতটা সম্ভব শরীরে তা সঞ্চিত রাখাটাই তো শ্রেয়!

পাঁচ বছর পর, বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা শেষ হল। কিন্তু তার তিন বছর পর, ২০২২-এ, সব স্প্রুস গাছকেই দিতে হল আসল পরীক্ষা। সে বছর ইউরোপের জুড়ে দেখা দেয় প্রচণ্ড খরা। জার্মানিও তার শিকার হয়। তেমন খরা ৫০০ বছরের মধ্যে আগে কখনও হয়নি ইরোপে। তেমনটাই বলা হয়। দেখা যায়, যে স্প্রুস গাছগুলি পাঁচ বছর ধরে, গবেষণার খাতিরে, জলাভাবের মধ্যে কাটিয়েছে, সেই প্রবল খরার মধ্যে অন্য গাছগুলি তুলনায় তারা থেকেছে অনেক বেশি সতেজ ও সবল। জলসঙ্কটের মধ্যে বেঁচে থাকার কৌশল তারা যে আগেই রপ্ত করে নিয়েছিল।

আবার, সুইজারল্যান্ডের আল্পস পাহাড়ে গজায় পাইন গাছ। গ্রীষ্মকালে সেখানকার পরিবেশ থাকে শুষ্ক। কিন্তু, ২০০৩ সালে, বিজ্ঞানীরা বেছে নেনে ৯০০ গাছের একটি জঙ্গল। গ্রীষ্মের শুষ্ক পরিবেশ বজায় না রেখে, তাঁরা প্রতি বছর, ওই সময়, ওই জঙ্গলের অর্ধেক গাছে প্রচুর জল দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। দশ বছর এই ব্যবস্থা চালু থাকার পর, ২০১৩-তে, তাঁরা ওই গাছগুলিতে জল দেওয়া বন্ধ করে দেন। পরীক্ষা করে দেখা যায়, যারা দশ বছর ধরে প্রতি গ্রীষ্মে জল পেয়ে এসেছে, জলের জোগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা সঙ্কট অনুভব করে। কিন্তু যারা স্বাভাবিক শুষ্ক পরিবেশে গ্রীষ্মের মাসগুলি কাটিয়েছে, জলের অভাব তাদের ওপর কোনও প্রভাব ফেলেনি। অর্থাৎ, যারা জল পাচ্ছিল তারা, অন্য এক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছিল ওই দশ বছরে।

গবেষকরা অবশ্য এও বলেছেন যে, সব গাছ যে নতুন অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে, তেমন কোনও কথা নেই।

ছবি: নিজস্ব

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভালো হরমোন বাড়ায় কুকুর, বেড়াল

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস