উষ্ণায়নে অসহায় অবলা জীবেরা

 



যত দিন যাচ্ছে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ততই বেড়ে চলেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা যেভাবে চলেছি, তাতে তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা কম। ফলে, প্রতি বছর তাপপ্রবাহের বহরও বাড়বে। তার মানে, তাপপ্রবাহ ঘন ঘন দেখা দেবে এবং একটু বেশি দিন স্থায়ী হবে।

মানুষের শরীরের ওপর তাপপ্রবাহের প্রভাব ভাল হয় না, তা আমরা জানি। অনেক সময় আমাদের শরীর তা সহ্য করতে পারে না। কথায় বলে, ‘গরম লেগেছে। এবং তার পরিণাম অনেক সময় হয় মর্মান্তিক।

কিন্তু, পৃথিবীতে কেবল মানুষই বাস করে, এমন নয়। অন্যান্য প্রাণীরাও আছে। এবং তারা সবাই অবলা জীব। মানুষ নানাভাবে তাপপ্রবাহের প্রকোপ থেকে নিস্তার পাওয়ার চেষ্টা করে। নিজের ঘর ও শরীর ঠাণ্ডা রাখার নানান কৃত্রিম উপায়ের সাহায্য নিয়ে থাকে সে। অবস্থা খারাপ হলে, সে যেতে পারে হাসপাতালেও। সে তুলনায় পৃথিবীর বাকি বাসিন্দারা অনেক বেশি অসহায়।

তাপপ্রবাহে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে অন্যান্য প্রাণীরাও। এমনকি তাদের মৃত্যুও হতে পারে। কিন্তু তাদের দুর্দশার কথা আমরা তেমন জানতে পারি না। মোঙ্গাবে-ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত একপ্রতিবেদন থেকে জানা গেছে যে, তাপপ্রবাহ তীব্র হলে, সেই গরম তাদের শরীরে হিট স্ট্রেসবা গরমজনিত চাপ সৃষ্টি করে। তার ফলে, শরীরের জরুরি হরমোন উৎপাদন ও তার জোগান ব্যাহত হয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, হিট-স্ট্রেস কী? হিট-স্ট্রেস বা গরমজনিত চাপ হল সেই পরিস্থিতি যেখানে শরীরের মধ্যে উৎপন্ন তাপ শরীর থেকে বার করা সম্ভব হয় না। আমরা নানাভাবে শরীর ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করি। স্নান করে, ঠাণ্ডা জল পান করে, পাখার তলায় বসে, অথবা, সামর্থ্য থাকলে, এসি চালিয়ে আমরা নিজেদের ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা করি। কিন্তু তাপপ্রবাহ চলা কালে আমাদের যদি বাইরের তীব্র গরমের মধ্যে অনেকক্ষণ কাটাতে হয়, তাহলে শরীরের নিজস্ব তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তখন আর কাজ করে না। গরম লেগে যায়।

মোঙ্গাবে’র প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, অন্যান্যদের প্রাণীদের ক্ষেত্রেও তাইই হয়। স্বাভিক তাপমাত্রায় শরীর গরম বা ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা তাদের দেহের মধ্যেই আছে। কিন্তু অস্বাভাবিক তাপমাত্রা যদি বেশি দিন স্থায়ী হয়, তখন তারা নিরুপায় হয়ে পড়ে। নিজেদের বাসস্থান কৃত্রিম উপায়ে ঠান্ডা রাখার কোনও উপায় তাদের কাছে নেই। না আছে পাখা, না এসি, না শীতল পানীয়!

ভারতে গৃহপালিত পশুদের ওপর সমীক্ষা করে দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের ফলে তাদের শরীরে নানান হরমোনের মাত্রা ওলট-পালট হয়ে যায়। তার ফলে, তাদের রক্তচাপ বাড়ে, হৃস্পন্দন এতটাই বেড়ে যায় যে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দেয়। দেখা গেছে, এই কারণে রাজস্থানে গরুরা খাওয়া কমিয়ে দেয়। উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায় তাদের দুধ উৎপাদনও।

একটা সময় ছিল যখন দিল্লিতে গ্রীষ্মের দুমাস দুধের মিষ্টি তৈরি করা নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, সেই সময় গরু মোশের দুধ উৎপাদন অনেকটাই কমে যেত। যে পরিমাণ দুধ পাওয়া যেত, তা পান করতেই মূলত খরচ করা হত। ওই দুমাস দুধের মিষ্টি তৈরি করা ছিল অপরাধের সমতুল্য। সেটা ছিল উষ্ণায়নের আগের সময়। অথচ, তখনও গরমের সময় প্রাণীরা চাপের শিকার হত। আর এখন তো লাগাম-ছাড়া উষ্ণায়নের যুগ। তাপপ্রবাহ এখন বার বার দেখা দিচ্ছে। আগামী দিনে নাকি আরও উগ্র রূপ ধারণ করবে ওই অগ্নিগর্ভ দিনগুলি। তখন মানুষের মতো আর সব প্রাণীই বিপন্ন বোধ করবে। আমরা সেই দীর্ঘ দগ্ধ দিনগুলিতে সুস্থ থাকার উপায় খুঁজতে পারব। অন্য প্রাণীরা হয়ত চেষ্টা করেও পারবে না।

ছবি: নিজস্ব

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভালো হরমোন বাড়ায় কুকুর, বেড়াল

গাছেরা কি দেখতে পায়

অন্ধকারকে মানুষ ভয় পায় কেন