ভবঘুরে এবার গৃহী হয়েছে
অনেক দিনের ভবঘুরে জীবন ত্যাগ করে পটল এখন গৃহী হয়েছে। (আগের পোস্ট দেখুন: ভবঘুরে পটলের বিচিত্র জীবন, 15, 2025) পটলের কোনও সঙ্গী ছিল না। ওর কোনও দল তৈরি হয়নি। আর পাঁচটা কুকুরে মতো কোনও নিজস্ব এলাকাও সে বেছে নিতে পারেনি কোনওদিন। সঙ্গীবিহীন, এলাকাহীন, একাকী এক সাদা-কালো দিশি কুকুর পটল। অন্তত তেমনটাই ছিল সে এই কিছুদিন আগেও। এখন তার জীবন বদলে গেছে। এবং নিজের জীবনে পরিবর্তন সে এনেছে নিজেই।
পটল
একটি মেয়ে কুকুর। বছর আষ্টেক বয়স এখন তার। তাকে যখন প্রথম দেখি, তখন সে মাস তিনেকের হবে। কারা যেন তাকে
ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিল সল্টলেকের সিকে-সিএল পার্কে। এক সকালে, সরু গলায় চিৎকার করছিল সে। দেখা গেল, একটি কুকুর বাচ্চা। গায়ে দগদগে ক্ষত।
যন্ত্রণা আর খিদেয় চেঁচাচ্ছে। পৃথিবীর ডায়েরি পত্রিকার সম্পাদক মালবী গুপ্ত’র তত্ত্বাবধানে শুরু হয় তার শুশ্রূষা।
বাড়ি থেকে আসতে থাকল খাবার। একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠল সে। আমার বোন তার নাম
রাখলেন, পটল।
ওই
পার্কই তার ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলো না। প্রাপ্ত বয়েসের হওয়া মাত্রই তার
পাঁচটি ফুটফুটে বাচ্চা হলো। একটি বাড়ির বাগানে বসে সে দুধ খাওয়াত তার ছানাদের।
একটু বড়ো হতেই কৌতূহলী ছানারা পা বাড়ালো রাস্তার দিকে। ফলে, তিনটি গেল ছুটন্ত গাড়ির চাকার তলায়। আর
একটির প্রাণ গেল ভাইরাসের আক্রমণে। বাঁচল একটি। তার গায়ের রং কালো। কিন্তু তার
আশ্রয়দাতারা ভালোবেসে তার নাম রাখলেন ‘লালী’। একজন স্থানীয় পশুপ্রেমী পটলের
অপারেশন করিয়ে দিলেন। তাই ওর আর বাচ্চা হলো না। এবং ঘটনাচক্রে সিকে-সিএল পার্কেও
থাকা হলো না ওর। পার্কের অন্য সারমেয়রা পটলকে পাড়া-ছাড়া করে ছাড়ল।
রয়ে
গেল লালী। পার্ক-লাগোয়া একটি বাড়ির কেয়ার-টেকার
পরিবার, তাকে
খাইয়ে পরিয়ে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে রেখে ছিলেন। ওই বাড়িতেই জন্মে ছিল সে। কিন্তু বছর
দুয়েকের মাথায়, সেই
বাড়ি গেল বিক্রি হয়ে। কেয়ার-টেকার পরিবার চলে গেলেন। বাড়ির নতুন মালিক গেটে তালা
ঝোলালেন। ঘেরাটোপ থেকে লালি বিতাড়িত হলো ফুটপাথে। রাস্তায় চরে খাওয়া ও বেঁচে থাকার
নির্মম নিয়মগুলি সে আয়ত্ত করেনি কোনও দিন। বন্ধ গেটের সামনে ও বসে থাকে। গেট খুললে, আবার ঢুকবে ওর নিরাপদ আশ্রয়ে, হয়ত সেই অশায়। কিন্তু গেট খোলে না।
পাড়ার আর পাঁচটা সরমেয় এসে লালিকে উত্ত্যক্ত করে। একদিন সকালে লালীকে আর দেখা গেল না। বিকেলেও না। পরের
দিন সকালেও না।
খোঁজ
শুরু হল। ফোন গেল সদ্য চলে-যাওয়া কেয়ার-টেকার পরিবারের এক সদস্যের কাছে। তাঁরা কি
নিয়ে গেছেন লালীকে তাঁদের নতুন বাসস্থানে? না, তাঁরা নিয়ে যাননি। তাঁদের নিজেদের বাড়িটি খুব ছোট। তবে দু তিন দিন
পরে লালীর সন্ধান মিলল। দুটি ব্লক দূরে পাওয়া গেল তাকে। শহরে বেঁচে থাকার নিয়মগুলি
আয়ত্ত করার জন্য তাকে আর রাস্তায় ছেড়ে রাখা যায়নি। আমার বাড়িতেই আশ্রয়
হলো পটলের মেয়ের।
অন্য দিকে, সিকে-সিএল মাঠ ছেড়ে চলে যায় পটল। সেই শুরু তার ভবঘুরে জীবনের। কখনও সে থাকে ডিএল
ব্লকের পার্কে। কখনও করুণাময়ী মেট্রো স্টেশনের শিঁড়িতে। অথবা তার পাশে দূরপাল্লার বাস টার্মিনাসে। কিংবা বই
মেলা চত্বরে। আবার, বেশ কিছু দূরে, সেক্টর-৫’র মোটর ভিহিক্ল কার্যালয়ের আশেপাশে। বা উইপ্রোর অফিস চত্বরেও তার
দেখা মিলেছে দু’একবার।
সিএল ব্লকে আমার বাড়ির রাস্তায়ও এসেছে কখনও-সখনও। এক দু’ রাত কাটিয়ে আবার চলে গেছে, যেখানে মন চায়। এমনি করেই চলছিল পটলের
ছিন্নমূল জীবন। আর আমি ছিলাম তার ওই ভবঘুরেপনার সাক্ষী। কারণ, রোজ সকালে তার জন্য বরাদ্দ মাংস-ভাত
তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার। এমনও দিন গেছে যখন কোথাও তার দেখা
মেলেনি। প্যাকেট ভর্তি খাবার পকেটে নিয়ে বাড়ি ফিরেছি।
কী
জানি কেন, গত বছর মে মাসে, পটলের মতিগতি পালটাল। সিএল ব্লকে আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় সে ঘন
ঘন আসা-যাওয়া শুরু করল। রাত্রে ডাকাডাকি করে। পাশেই নির্মীয়মাণ এক বাড়ির রাতের
রক্ষীদের নিশ্চিন্ত করল তার পাহারাদরি। তাঁরা বললেন, “বহুত আচ্ছা কুত্তা হ্যায়!”
এবার, ধাপে ধাপে এগোল পটল। গেট খোলা পেলে, রাস্তা ছেড়ে সে ঢুকতে শুরু করল বাড়ির
পাশে এক ফালি ড্রাইভওয়েতে। সেখানেই সে রাত কাটায়। মাঝরাতে রাস্তায় লোকজনকে চলাফেরা
করতে দেখলে, বিরক্তি
প্রকাশ করে। ওর গলার আওয়াজ বেশ জোরাল। যে কোনও মানুষের রাতের ঘুম ছুটিয়ে দেওয়ার
পক্ষে যথেষ্ট। তাই যথাসময়ে নালিশও এলো ওর বিরুদ্ধে। এবং ব্যবস্থাও নিতে হল সেই
অনুযায়ী।
রাতে
তার থাকার জায়গা করে দেওয়া হলো বাড়ির এক তলায়, সিঁড়িতে। একটা সময় বন্ধ করে দেওয়া হত দরজা। সেটাই হলো তার রাতের নতুন
আস্তানা। বাইরের হাঁকডাক বন্ধ হলো। ঘুমে আর ব্যঘাত ঘটল না
কারওরই।
কয়েক দিনের মধ্যেই অবশ্য সে উঠে গেল আরও ওপরে, সিঁড়ির ল্যাডিংয়ে। তারপর, অচিরেই দোতলায়, দরজার সামনে, আরও প্রশস্ত জায়গায়। দিনে বাইরে, রাতে ভিতরে — এই ব্যবস্থাতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠল সে।
কিন্তু
সেপ্টেম্বর মাসে, যে রাতে মেঘভাঙা বর্ষণে কলকাতা ভাসল, সেই রাতে, প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ, আমাদের তিন তলার ফ্ল্যাটের দরজায় মৃদু
ধাক্কার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। তখনও অন্ধকার। বাইরে অঝোরে পড়ছে বৃষ্টি। আকাশভাঙ্গা
দুর্যোগের রাতে দরজায় আলতো ধাক্কার শব্দ! কী হতে পারে?
বিছানা
ছেড়ে উঠলাম। আলো জ্বাললাম ঘরের ও বাইরের। দরজার ম্যাজিক আই দিয়ে ওপাশে কে আছে
দেখার চেষ্টা করলাম। নজরে এলো না কেউ। ছিটকিনি নামিয়ে, সন্তর্পণে দরজা একটু ফাঁক করতেই, কুঁইকুঁই করে, হুড়মুড়িয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল পটল।
সেই
থেকে পটল আমাদের ফ্ল্যাটেই আছে। সেখানেই খাওয়া-দাওয়া করে। কয়েকজন স্বজাতি সঙ্গীও
পেয়েছে সে। আর পেয়েছে লালীকে। পটলকে পেয়ে লালিরও মন ভালো। সকালে ও বিকেলে
কিছুটা সময় পটল বাইরে কাটায়। তারপর সুখী গৃহকোণে শুয়েবসে দিন কাটে তার।
খাওয়ানর
জন্য, পটলের
খোঁজে আমায় এদিক ওদিক যেতে হয় না আর।
কিন্তু
এত দিনের স্বাধীন জীবন ত্যাগ করল কেন সে? এত কাল পরে, খোলা হওয়া, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানর অবাধ স্বাধীনতা ও যা পাই
তাই খাওয়ার ব্যবস্থা ছেড়ে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে এক বাঁধাধরা জীবন বেছে নিল কেন সে? এত কাল তো সে থাকত আর পাঁচটা পথকুকুরের
মতোই। রাস্তায়। তাকে ধরে বেঁধে আনা হয়নি। সে তো ঘরমুখো হল স্বেচ্ছায়।
কী কাজ করে ছিল ওই ভবঘুরের মনে? কুকুরের মনসতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন
যাঁরা, তাঁরা
নিশ্চই এই
প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন।
অনীশ
গুপ্ত; ছবি: নিজস্ব

Comments
Post a Comment