ভবঘুরে পটলের বিচিত্র জীবন
সব কুকুরেরই একটা নির্দিষ্ট জায়গা থাকে। হাবলু কালু, ভুতো, লালি, কুকি - আমাদের আদর-অনাদরের দেশীরা জন্মের পর, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, নিজেদের থাকার জায়গা ঠিক করে নেয়।
কেউ বেছে নেয় রাস্তার মোড়, কেউ থাকে গলিতে, কেউ পার্কে, কেউ বাজারের আশেপাশে, কেউ আবার অমুকদের বাড়ির উঠনের এক
কোণে জায়গা পায়। সেখানেই তারা থাকে। কয়েকজন মিলে, নিজেদের একটা ছোটখাট দল তৈরি করে। একা থাকা ওরা
মোটেই পছন্দ করে না। আর নিজেদের জায়গা সম্পর্কে ওরা বেশ সচেতন। বহিরাগত কেউ তাদের
আস্তানার সীমানার মধ্যে পা রাখলেই, গোলমাল বাধে।
কিন্তু পটলের বাড়ি কোথায়? কেউ জানে না। পটল নিজেও জানে না কোথায় তার স্থায়ী আস্তানা। ওর কোনও
দলও নেই। ও একা একা থাকে। আজ এখান, কাল সেখান। প্রকৃত অর্থেই ও ভবঘুরে। এটাও লক্ষণীয় যে, পটল যখন এ-পাড়া থেকে ও-পাড়া, ও-পাড়া থেকে সে-পাড়ার মধ্যে চলা ফেরা
করে, তখন সেই সব পাড়ার স্থায়ী সারমেয়রা
কিন্তু পটলের পথ আটকায় না। ওর ওপর চড়াও হয় না দল বেঁধে। ওকে নিরাপদে যাওয়া আসা
করতে দেয়। কেন দেয়, সে এক রহস্য।
পটল একটি মেয়ে কুকুর। এক দিন সকালে ওকে দেখা গিয়ে ছিল সল্টলেকের
সিকে-সিএল ব্লকের মাঠে। তখন তার বয়স মাস তিনেক হবে। ছোট্ট শরীর। ঘাড়ে, পায়ে দগদগে ঘা। থেকে থেকে চিৎকার করে
উঠছে। অন্য কোথাও থেকে কেউ ওকে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল ওই পার্কে। তখন ওর কোনও নাম ছিল
না। পৃথিবীর ডায়েরির সম্পাদক, মালবী, ওকে খাইয়েদাইয়ে, দিনের পর দিন ওষুধ লাগিয়ে, ভাল করে তোলেন। আমার বোন, অনিন্দিতা, ওর নাম রাখেন ‘পটল’। সেই থেকে সিকে-সিএল ব্লকে অনেকেই পটল নামে
চেনেন ওই সাদা-কালোকে। ওকে ভালও বাসেন তাঁরা।
এক বছরের মাথায়, পটলের পাঁচটি ফুটফুটে ছানা হয়। তবে একটি ছাড়া বাঁচে না বাকিরা।
পার্কের পাশের রাস্তায় গাড়ি চলে অনেক। কিছু চলে বেশ জোরে। ছানাগুলি রাস্তায় নেমে, গাড়ির গতি আন্দাজ করতে পারেনি। সরতে
পারেনি সময় মতো। আর ছানা হয়নি পটলের। হাল আমলের রীতি অনুযায়ী, তার অপারেশন করিয়ে দেন এক
পশুপ্রেমিক।
পার্কেই দিন কাটছিল পটলের। কিন্তু তার প্রতি বিরূপ হল ধানিলঙ্কা ও তার
মেয়ে, উচ্ছে। ধানিলঙ্কার রঙ বাদামি।
আকার-আকৃতি ছোট। তবে তেজ খুব। রঙ সাদা-কালো-বাদামী হলেও, চেহারার দিক থেকে, উচ্ছেকে মায়ের কার্বন কপি বলা যায়।
দু’ জনে দাপিয়ে বেড়াত পার্কের এক দিকে।
আর তাদের সঙ্গে তালে তাল মেলাত ধানিলঙ্কার বোন, গাজর। তিন জনে মিলে, পটলকে পার্ক ছাড়া করল এক দিন।
সেই থেকে ছিন্নমূল পটল ঘুরে বেড়ায় এদিক সেদিক। কখনও সে দিন কাটায় এক
কিমি দূরে করুনাময়ী মেট্রো স্টেশনে ঢোকার সিঁড়িতে। কখনও সে থাকার জন্য বেছে নেয়, ডিএল ব্লকের মাঠ। এক বার, বিএল ব্লকের একটি বাড়ির গেট ঠেলে
বেরিয়ে আসতে দেখা গেল তাকে। এক বর্ষার মরসুমে সে আশ্রয় নিল সিএল ব্লকে আমার বাড়ির
এক তলায়। আবার সেখান থেকে নিজের ইচ্ছে মতো চলেও গেল এক দিন। এক বার সল্টলেকের
সেন্ট্রাল পার্কে আয়োজিত বই মেলায় দেখা হল পটলের সঙ্গে। লফিয়ে-ঝাঁপিয়ে, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে পরিচিত জনের
সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ প্রকাশ করল সে। তার পর আবার কয়েক দিন দেখা নেই। রোজই খোঁজ
করা হয়। এক সকালে হঠাৎই আবার দেখা গেল তাকে। সেক্টর-ফাইভে, উইপ্রো’র বিরাট অফিস চত্তরে সে ঢুকে যাচ্ছে
গট গট করে। সেখানে রোদে গা এলিয়ে শুয়ে থাকা আর তিনটে কুকুর ওকে কোনও বাধা দিল না।
কয়েক দিন পর, আবার ফিরে এলো
ডিএল-এর মাঠে।
এখন প্রায়ই ভোর রাতে, সিএল ব্লকে, আমার বাড়ির
সামনে, আসে। সকালে কিছু ক্ষণ কাটিয়ে আবার
চলে যায় যে দিকে মন চায়। সিএল পার্কেও সময় কাটায় আজকাল। সেখানে এখন উচ্ছে নেই। গত
বছর এক দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় তার। তারও আগে, এক গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ সম্ভবত সইতে পারেনি গাজর। ধানিলঙ্কা একা আছে।
কিন্তু পটলকে দেখলে, সে এখন ভয় পায়।
পটলের স্বাস্থ্য ভাল। খাবারের কোনও ঘাটতি আছে বলে মনে হয় না। রোজ
খাবারের প্যাকেট নিয়ে বেরই। দেখা পেলে খাওয়াই। মনে হয়, তার আরও অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছেন
নানা দিকে। তাঁরাও বোধহয় পটলের আহারের ব্যবস্থা করেন।
সঙ্গীহীন, একাকী, এলাকাবিহীন, এমন ভবঘুরে কুকুর বোধহয় লাখে একটা
হয়।
অনীশ গুপ্ত
ছবি: লেখক

Comments
Post a Comment