তুঙ্গনাথে বরফ নেই

 


পর্বত বিশারদরা কি প্রমাদ গুনছেন? হয়ত। তার যথেষ্ট কারণও আছে। এই জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়েও হিমালয়ের তুঙ্গনাথ পাহাড় ছিল বরফহীন। ওই সময়ে, ওই পর্বত শৃঙ্গ তুষারে ঢাকা থাকার কথা। যাঁরা হিমালয়ের আকর্ষণে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন প্রতি বছর, তাঁরা সে কথা জানেন। আর হিমালয় নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা তো জানেনই। কিন্তু এই বছরের শুরুতে, তুঙ্গনাথের মাথায় ছিল না বরফের সাদা মুকুট। হাড় কাঁপানো শীতের মাসে, তুঙ্গনাথ বরফহীন  সে এক অস্বস্তিকর দৃশ্য!

শুধু তুঙ্গনাথ নয়, সারা হিমালয় পর্বতমালায়ই নাকি এই শীতেরমরসুমে তুষার ও বৃষ্টির ঘাটতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে। এবং প্রকৃতির ওই কার্পণ্য দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হিমালয় বিশেষজ্ঞরা। বেশ কয়েক বছর ধরেই হিমালয়ের আবহাওয়ায় এক পরিবর্তন ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। বর্ষার সময় বৃষ্টিপাত প্রলয়ের আকার ধারণ করেছে পর পর কয়েক বছর। এখন আবার শীতের দিনে বৃষ্টি ও তুষারপাতের ঘটাতি দেখা দিচ্ছে।

কয়েক বছর ধরেই শোনা যাচ্ছে যে, হিমালয়ের তুষার সীমা ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে বরফের চাদর দেখা যেত, এখন সেখানে বরফ গলে পাথর বেরিয়ে পড়েছে। তুষার বলয়ে পৌঁছতে গেলে, উঠতে হচ্ছে আরও উঁচুতে। গবেষকরা বলছেন, বিগত দুই তিন দশক ধরেই তুষার সীমা একটু একটু করে পিছিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা বলছেন, উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলার হার বেড়েছে। তার সঙ্গে তুষারপাতের পরিমাণও যদি কমে যায়, তাহলে পরিস্থিতিটা বেশ ঘোরালো হয়ে উঠবে।

গবেষকরা বলছেন, হিমালয়ের বিভিন্ন জায়গায় হিমবাহগুলি যে শীতের মরসুমেও ওপরের দিকেই উঠে যাচ্ছে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। কুড়ি তিরিশ বছর আগেও এমনটা হতো না। উষ্ণায়ন ও তুষারপাতের ঘাটতির ফলে বেরিয়ে পড়ছে পাথর। অথচ, এক সময় ওই সব জায়গা তুষারে ঢাকা থকত।

হিমালয়ে গোরি গঙ্গা নামের এক জলবিভাজিকা আছে। উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে, কুমায়ুন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা দেখেছেন যে, যেখানকার হিমবাহ প্রায় ৫০০ মিটার ওপরে উঠে গেছে। আর তুষারের চাদর সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, সেখানে এখন গাছ গজাতে শুরু করেছে। অথচ, ওই উচ্চতায় (৪৬৬৫ মিটার) গাছ জন্মানর কথা নয়। উদ্ভিদ সীমার অনেক ওপরে ওই জায়গা। গবেষকরা বলছেন, উষ্ণায়ন ও অপর্যাপ্ত তুষারপাত সেখানে গাছেদের জায়গা করে দিচ্ছে। নাসার উপগ্রহ চিত্রও দেখিয়েছে যে, এভারেস্টে-এর আশেপাশের হিমবাহ প্রায় ৫০০ ফিট ওপরে উঠে গেছে।

জানা যাচ্ছে যে, দুই মেরু অঞ্চলের পরেই সবচেয়ে বেশি হিমবাহ আছে হিমালয়ে। সেগুলি অস্বাভাবিক হারে গলতে থাকা মানে, সমগ্র এশিয়া মহাদেশজুড়ে এক তীব্র জল কষ্ট দেখা দিতে পারে ভবিষ্যতে। এবং এও দেখা গেছে যে, জলের অভাব ও সভ্যতার সংকট একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

তাছাড়া, হিমবাহগুলি দ্রুত হারে গলে যাওয়ার ফলে যে জল সেখান থেকে বেরচ্ছে, তা জমা হচ্ছে হিমালয়ের নানা হ্রদে। এবং সেগুলির ধারণ ক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলেই, বাঁধ ভাঙছে। সৃষ্টি হচ্ছে বিধ্বংসী হড়পা বান। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দিনগুলিতে তেমন বিপর্যয় আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।

ছবি নিজস্ব

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস