স্বাধীন গোল্ডফিস বিপদ ডেকে আনতে পারে
এক
সময় রাজা মহারাজা সুলতান বাদশাহরা হাতি ঘোড়া পুষতেন।
মুঘল সম্রাটরা আবার
চিতাও রাখতেন তাঁদের পশুশালায়। এখন আর সে সব দিন
নেই। রাজড়াজড়াদের রাজ্যপাট গেছে অনেক কাল।
এখন হাতি ঘোড়া পোষে
সরকার। মন্দির কর্তৃপক্ষ। কিম্বা যাঁরা
তাদের মাধ্যমে অর্থ উপার্যন করার কথা ভাবেন।সাধারণ মানুষ কুকুর
বেড়াল খরগোশ পাখি,
এদেরকেই সঙ্গী করে
নেন।
অনেকের আবার আছে মাছের সক। ছোট বড় মাঝারি অ্যাকুইরিয়ামে, রংবেরঙের নানা জাতের, নানা আকৃতির মাছ ঘুরপাক খায় তার জলে। নদী নালা খালবিলের মুক্ত জীবনের বদলে তাদের দিন কাটে অ্যাকুইরিয়ামের কাঁচের মধ্যে।
অ্যাকুইরিয়ামে বিভিন্ন ধরনের মাছ রাখেন বিভিন্ন জনে। তার মধ্যে গোল্ডফিশ একটি জনপ্রিয় পোষ্য। লালচে সোনালী রঙ। ফিনফিনে ল্যাজ ও পাখনা। এই সুন্দর মাছটি অনেকেরই প্রিয়।
তবে কথায় বলে বন্যরা বনে সুন্দর। তেমনি, গোল্ডফিশের ক্ষেত্রে বলে যায়, তারা অ্যাকুইরিয়ামেই সুন্দর। তারা যদি পুকুর বা কোনও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে, তাহলে সেই সুন্দর গোল্ডফিশই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এবং তারা যে পুকুর কিংবা খালবিলে পৌঁছে যায় না, তাও নয়। বাড়িতে রাখার ক্ষেত্রে অসুবিধে হলে, কেউ কেউ তাদের জলাভূমিতে ছেড়েও দেন।
আর বিপদের সূত্রপাত হয় তখনি। অ্যাকুইরিয়ামের ঘেরাটোপের মধ্যে তারা একরকম। কিন্তু একটু বড় জলাশয় বা জলাধারে মুক্তি পেলে তারা হয়ে যায় অন্য রকম। সেখানকার মুক্ত পরিবেশে তারা নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। তাদের এই প্রভাব বিস্তার স্থানীয় প্রাণী ও জলজ উদ্ভিদদের ক্ষেত্রে এক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, একটু একটু করে তারা সেই জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্রে পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করে। `জার্নাল অফ এনিম্যাল ইকোলজি’তে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে এই কথা বলা হয়েছে।
গবেষকরা দেখেছেন, যে জলাশয়ে গোল্ডফিশের আগমন হয়, সেখানে কয়েকটি স্পষ্ট পরিবর্তন ঘটে যায়।
দেখা গেছে, গোল্ডফিশের উপস্থিতির ফলে, একটি পুষ্টিগুণে ভরপুর জলাশয়ের জলের মান খারাপ হতে থাকে। জলের স্বচ্ছতা কমে গিয়ে তা ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে যায়। অর্থাৎ, জলে ভাসমান কণার পরিমান বাড়ে।
গবেষকরা দেখেছেন যে, স্থানীয় জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমে যায়। যেমন, শামুক, ছোট ছোট চিংড়ি জাতীয় পোকামাকড় যারা অ্যামফিপড নামে পরিচিত, ও জুপ্লাঙ্কটন বা অণুজীব। জলের মান খারাপ হয়ে যাওয়া ও তাদের অতি মাত্রায় খেয়ে ফেলার ফলে, তাদের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। অথচ, জলে খাদ্য চক্র বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ।
ন্থানীয় মাছেদের ওপরও তারা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গবেষকরা দেখেছেন, গোল্ডফিশের সঙ্গে থাকতে থাকতে স্থানীয় মাছেদের শরীরের আয়তন ছোট হয়ে যায়। তার মানে, তাদের খাদ্যের অভাব ঘটে। গোল্ডফিশরা সিংহভাগটাই খেয়ে নেয়। এবং তারা আর ছোট থাকে না। আকারে আকৃতিতে তারা বেশ বড় হয়ে ওঠে।
গবেষকরা বলেছেন যে, জলাশয় পুষ্টিগুণে সমৃধ্য হোক বা না হোক, যেখানেই গোল্ডফিশদের ছাড়া হয়, সেখানেই তারা বাস্তুতন্ত্রের বিশেষ ক্ষতি করে। এতটাই যে, একটি জলাশয়ের চরিত্রও বদলে যেতে পারে।
নভেম্বর২০২২-এ প্রকাশিত সিএনএন-এর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, ফ্রান্সের শ্যাম্পেন অঞ্চলে, ব্লুওয়াটার লেক-এ একটি দৈত্যকায় গোল্ডফিস আছে। সেটির ওজন ৩০ কিলোগ্রাম বা ৬৭ পাউন্ড। তার নাম ক্যারট। তুলনায়, একটি অ্যাকুইরিয়ামের গোল্ডফিসের ওজন ৫০০ গ্রামও হয় না। প্রায় ২০ বছর আগে ক্যারটকে ছাড়া হয় ওই লেকে।
গোল্ডফিশ
কি এমন মাছ যে প্রকৃতির মধ্যে মুক্ত করে দিলে তারা প্রকৃতিরই ক্ষতি করে বসে?
আসলে, যে গোল্ডফিশ আমাদের অ্যাকুয়ারিয়াম বা কাঁচের পাত্রে সাঁতরে বেড়ায়, তারা ঠিক আর পাঁচটা মাছের মতো নয়। ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা ছিন্ন হয়ে গেছে ১,০০০ বছরের কিছু আগে। তারা কার্প গোত্রের মাছ। কিন্তু চীন দেশের রাজারা সেই অত বছর আগেই তাদের জন্য আলাদা জলাশয় তৈরী করে, সেখানে তাদের আটকে রেখে, কৃত্রিম প্রজনন করিয়ে, তাদের এক বিশেষ রূপ দেন।
সেই থেকে পোষ্য হিসেবে একটু একটু করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তারা। গোল্ডফিশ নামে।

Comments
Post a Comment