গাছের অস্ত্রই মানুষের ওষুধ
গাছেরা
কি ভেবেচিন্তে, নিজেদের ভালমন্দ বুঝে কাজ করে? প্রশ্নটা নির্বোধের মতো মনে হতে পারে।
কারণ, গাছেদের তো মস্তিষ্ক নেই। তাদের পক্ষে
তো মাথা খাটিয়ে কিছু করার প্রশ্নই ওঠে না! কিন্তু গাছেদের রকম-সকম দেখলে মনে হবে
তাদের বুদ্ধি আছে।
আত্মরক্ষার
স্বার্থে, তারা নিজেদের শরীরে নানান ধরনের
রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে। উদ্দেশ্যটা হল জীবাণু, পোকামাকড়র, এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে গরু ছাগলদেরও
দূরে রাখা। কিন্তু, সব গাছ একই পদার্থ তৈরি করে, এমন নয়। বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে
আত্মরক্ষার জন্য রাসায়নিক পদার্থের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। এমনকি আলাদা পরিবেশে বেড়ে
ওঠা একই প্রজাতির গাছেদের মধ্যেও রাসায়নিক অস্ত্রশস্ত্রের রকমফের ঘটে।
এর
কারণ, সব প্রজাতির গাছের শত্রু এক নয়। কেউ
কালো শুঁয়োপোকার আগমনে শিউরে ওঠে, হয়
তো কেউ সবুজের
আনাগোনায় প্রমাদ গোনে। বাংলার তেঁতুল
গাছ হয়ত কোনও এক ধরনের জীবাণুকে আশকারা দিতে চায় না। আর তামিলনাডুতে সেই একই
তেঁতুল গাছের প্রধান শত্রু হয়ত অন্য কোনও জীবাণু। অর্থাৎ, গাছেরা তাদের প্রয়োজন মতো অস্ত্র
সানায়।
তবে
একথা বলা যায় যে, প্রতিটি উদ্ভিদই হল এক একটি রাসায়নিক
কারখানা। যেখানে তৈরি হয় বিভিন্ন যৌগের, বিভিন্ন তীব্রতার রাসায়নিক পদার্থ। সেগুলি গছেদের নিজস্ব প্রতিরোধ
ব্যবস্থার অঙ্গ। এবং সেই সব পদার্থের বেশ কিছু মানুষ নিজেকে রক্ষা করতে ওষুধ
হিসেবে ব্যবহার করে আসছে যুগ যুগ ধরে। এখনও করছে। এবং সন্ধান করে চলেছে গাছেদের
কাছ থেকে অসুখ সারানর আরও নতুন কী কী সব পদার্থ মিলতে পারে, সেগুলির। তাই বিশ্ব বাজারে বনৌষোধির
চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চাপ বাড়ছে ঔষোধী গছপালার ওপরও।
গাছের
নির্যাস থেকে তৈরি ওষুধের বাজার এখন যথেষ্ট বড়ো। তার বর্তমান আর্থিক মূল্য প্রায়২৫১ বিলিয় ডলার বা আনুমানিক ২২ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকা। তার বৃহৎ অংশটাই দখল করে
আছে ইউরোপ। মনে করা হচ্ছে,
২০৩৪ সাল নাগাদ, ওই বাজার বেড়ে দ্বিগুণ হবে। সেই বাড়তে
থাকা চাহিদা মেটানোর মতো ঔষধি গাছ বনে জঙ্গলে বা মাঠেঘাটে যথেষ্ট আছে কি?
ইংল্যান্ডেরইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানীরা দেখতে চাইছিলেন গাছেরা কীভাবে রাসায়নিক পদার্থ তৈরিকরে। গাছেদের কাছ থেকে পদ্ধতিটি জেনে নিতে পারলে, ওই জরুরি পদার্থগুলি গবেষণাগারে কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।
গবেষণার
জন্য যে গাছটি তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন, সেটি হল ‘ফ্লুয়েগ্গিয়া সাফ্ফ্রুটিকোসা’। ওই গাছ তৈরি করে ‘সাক্রিনাইন’ — এক ধরনের অ্যালকালয়েড বা উপক্ষার, যা ওষুধের কাজ করে। কিন্তু গবেষণা করতে
গিয়ে বিজ্ঞানী পেলেন এমন এক তথ্য, যা
তাঁদের বিস্মিত করে। তাঁরা দেখেন, গাছের
যে জিনটি ওই উপক্ষার তৈরি তদারকি করে, সেটির সঙ্গে জীবাণুর জিনের বিস্তর মিল। ওই জিন সাধারণভাবে গাছেদের মধ্যে
দেখা যাওয়ার কথা নয়। গবেষকরা মনে করছেন যে, গাছেরা কেবল নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োজনে, তারা জীবাণুদের রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদন
ব্যবস্থাও আত্মস্থ করে নেয়।
ইয়র্ক
বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের গবেষক বেঞ্জামিন লিচম্যান বলেছেন, গাছ এবং জীবাণু সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের
প্রাণরূপ। তাই জীবাণুর জিনের মতো জিন যে একটি গাছের এই গুরুত্বপূর্ণ উপক্ষারের
উৎপাদন পরিচালনা করছে, সেটা খুবই আশ্চর্য্যরে। এবং লিচম্যান
জানিয়েছেন, এটাও উল্লেখযোগ্য যে, গাছটি অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ তৈরি
করতে যে পদ্ধতি অবলম্বন করে, সুক্রিনাইন
তৈরি করতে সে অবলম্বন করে সম্পূর্ণ এক অন্য পদ্ধতি। পরে গবেষকরা আরও অনেক গাছের
মধ্যে একই ধরনের জিন খুঁজে পান।
গবেষকরা
বলেছেন, ভবিষ্যতে ওই জিনগুলির সাহায্যে, গবেষণাগারেই তৈরি করা যাবে জরুরি সব
রাসায়নিক পদার্থ, যা ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহার করা যাবে।
ফলে, পরিবেশের ক্ষতি করে বিরল সব ঔষধি
গাছগাছালি প্রকৃতির কোল থেকে তুলে আনাতে হবে না।
ছবি: নিজস্ব

Comments
Post a Comment