বিপদ ঘনাচ্ছে দেবভূমিতে
উত্তরাখন্ডের তপোবনে এখন ভয় ও শোকের ছায়া। ৭ ফেব্রুয়ারি ছিল
রবিবার। চামোলী জেলার তপোবনে ঋষিগঙ্গা বয়ে যাচ্ছিল নিজের স্বাভাবিক গতিতে। তপোবনে তাপবিদ্যুৎ
কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ হচ্ছিল রোজকার মতো। শীতের নিরিবিলি সকালে প্রকৃতি ছিল ফুরফুরে
মেজাজে। তারই মধ্যে হঠাৎ শোনা গেল এক বিকট গর্জন। শান্ত নদীটি মুহূর্তের মধ্যে ফুলে-ফেঁপে
এক বিকট দৈত্যের আকার ধারণ করে, চারপাশ ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে, ধেয়ে আসে গিরিখাদ দিয়ে। তাপবিদ্যুৎ
প্রকল্পের কর্মীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, খড়কুটোর মত উড়ে যায় নদী বাঁধ। নিখোঁজ হন প্রায়
২০০ শ্রমিক। পরে ৩০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাকিদের খোঁজ চলছে।
কেন এমন বিপর্যয় ঘটল তা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। বলা হচ্ছে, ৫,৬০০
মিটার (১৮,৪৮০ ফিট) ওপরে, হিমবাহের একটা বড় অংশ ভেঙ্গে নদীতে পড়ে্। ফলে নদীর জল বেড়ে
যায়। আবার এও বলা হচ্ছে যে, হিমবাহ যেখানে ভেঙ্গে পড়ে, সেখানে বড় ধরনের ধস নামে। তার
ফলে, নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে জল জমতে থাকে। এবং সেই বিপুল পরিমাণ আটকে-যাওয়া জল এক সময়
মাটি কাদা পাথরের বাঁধ ভেঙ্গে ভয়ঙ্কর বেগে নীচের দিকে নেমে আসে।
তাছাড়া শীতের মরশুমে হিমবাহ কেন ভেঙ্গে পড়ল, তাই নিয়েও্ উঠছে
প্রশ্ন। একটা মত হল, উষ্ণায়নের ফলে, হিমবাহটি বেশি গলে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সেই
সঙ্গে, আগের কয়েক দিন ভারি তুষারপাত হওয়ায়, বরফের সেই বাড়তি চাপ হিমবাহটি সহ্য করতে
পারেনি। আবার অনেকে বলছেন রাস্তা বড় করা ও অন্যান্য প্রকল্পের কাজের জন্য গাঢ়বাল হিমালয়
জুড়ে লাগাতার ডিনামাইট দিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে বিস্ফোরণ, খনন, পাথর ভাঙ্গা আর গাছ কাটার
ফলে হিমালয় ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। নির্দিষ্ট কারণটা জানা যাবে কিছুদিন পরে।
পাহাড় ভাঙ্গার কাজ চলছেই
তবে উষ্ণায়নের প্রভাব যে পাহাড়ে যথেষ্ট পড়ছে তা জানা গেছে এক
গবেষণা পত্র থেকে। তাতে বলা হয়েছে যে, ২০০০ সালের পর থেকে হিমালয়ের হিমবাহগুলি খুব
দ্রুত গলে যাচ্ছে। গত ১৯ বছরের মধ্যে প্রায় দেড় ফুটের মত পুরু বরফ খুইছে সেগুলি। বিজ্ঞানীরা
মনে করছেন উষ্ণায়নই এর প্রধান কারণ। ‘সায়েন্স অ্যাডভান্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে
এই তথ্য। গবেষণা পত্রে আরও বলা হয়েছে যে, এই হারে হিমালয়ের বরফ গলতে থাকলে, ভারত সহ
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তীব্র জলকষ্ট দেখা দেবে।
ভারত, চিন, নেপাল ও ভুটান থেকে পাওয়া গত ৪০ বছরের উপগ্রহ চিত্র
বিশ্লেষণ করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভারসিটির গবেষক জশুয়া মৌরার। তাতেই
দেখা যায় যে খুব দ্রুত গলছে হিমালয়ের হিমবাহগুলি। ১৯৭৫ থেকে ২০০০ পর্যন্ত যে হারে গলে
ছিল সেগুলি, ২০০০ সালের পর থেকে সেই হার দ্বিগুণ হয়েছে।
মৌরার বলেছেন যে এত স্পষ্ট ছবি আগে কখনও পাওয়া যায়নি। এবং তিনি
আশঙ্কা করছেন যে, হিমালয় বোধহয় তার এক-চতুর্থাংশ বরফ ইতিমধ্যেই হারিয়েছে। তিনি বলেছেন
যে, বিগত কয়েক বছর ধরে স্থির হারে গলছে বরফ। তার জন্য উনি পাহাড়ের তাপমাত্রাকেই দায়ী
করেছেন। দেখা গেছে ১৯৭৫ থেকে ২০০০ পর্যন্ত যে গড় তাপমাত্রা ছিল হিমালয়ের বিভিন্ন জায়গায়,
২০০০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সেই গড় তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বেশি ছিল সর্বত্র।
গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, এশিয়ার নানান দেশে এখন অনেক বেশি পরিমাণে
তেল বা জৈব জ্বালানি পোড়ানো হয়। তার ফলে, আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্বন-যুক্ত ধোঁয়া
হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে হিমবাহগুলির ওপর জমা হচ্ছে আর তুষারের ওপর তৈরি হচ্ছে কার্বনের
কালো আস্তরণ। কার্বনের সেই আস্তরণ সূর্যর আলো শুষে নিয়ে তাপ বাড়াচ্ছে। তার ফলে, আগের
চেয়ে দ্বিগুণ হারে গলছে বরফ।
আর সেই সঙ্গে, রাস্তা তৈরির জন্য যে ধুলো বাতাসে ওড়ে, তাও এক
সময় হিমবাহের তুষারের ওপর জমা হয়। কার্বনের আস্তরণের মত, ধুলোর প্রলেপও সূর্যর আলো
শুষে নিয়ে হিমবাহের তাপ মাত্রা বাড়াতে থাকে। চিনের এক গবেষণা পত্রে এমনটাই বলা হয়েছে।
উত্তরাখণ্ডের ‘চার ধাম’ প্রকল্পের আওতায় রাস্তা চওড়া করার এক
বিপুল কর্মকাণ্ড চলছিল কোভিড-১৯ অতিমারি ও লকডাউনের আগে। শ’য়ে শ’য়ে গাছ কাটা তো হচ্ছিলই,
সেইসঙ্গে চলছিল ব্লাস্টিং আর পাথর ভাঙ্গার কাজ। তার ফলে, মাঝে মাঝেই ধুলোর ঘন মেঘেঢেকে যাচ্ছিল পাহাড়, নদী, জঙ্গল সবই। ২০১৯-এ নভেম্বরে, পাহাড়ের বাসিন্দারা ‘পৃথিবীর
ডায়েরি’কে বলেছিলেন যে, ওই ধুলোর কারণে অনেকেই আজ পাহাড়ে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন।
রাস্তা আর অন্য সব প্রকল্পের কাজের দৌলতে বিপুল পরিমাণ ধুলিকণা
বাতাসে মিশছে। কিন্তু চামোলীর এই সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য সেই ধুলোর অবদান
কতটা তা কি জানা যাবে কোনও দিন?
অনীশ
গুপ্ত
ছবি: পৃথিবীর ডায়েরি
আগের লেখা দেখুন: উন্নয়নের জেরে হিমালয়ে ধুলোর মেঘ



Comments
Post a Comment