ম্যামথের বাড়ি
রাশিয়ার ধূসর, হাড়-কাঁপানো সাইবেরিয়ায়, একটা বেশ বড়সড় বাড়ির
অবশেষ আবিষ্কার করেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। যে ধ্বংসাবশেষ তাঁরা পেয়েছেন, তা থেকে তাঁদের
অনুমান, বাড়িটা ২৫ হাজার বছর আগে তৈরি হয়েছিল। গোলাকৃতি সেই বাড়িটা ৪০ ফিট চওড়া। কিন্তু কাঠ, পাথর, মাটি বা বাড়ি তৈরির
অন্যান্য কোনও প্রচলিত বস্তু দিয়ে তৈরি হয়নি সেটি। বাড়িটি তৈরি হয়েছিল ম্যামথের হাড়,
দাঁত আর চামড়া দিয়ে।
ম্যামথ হল সেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া লোমোশ হাতি, যারা তুষার যুগে
ঘুরে বেড়াত এই পৃথিবীতে। আজকের আফ্রিকান হাতির চেয়েও বেশ বড় ছিল তারা। তুষার যুগের
ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা আটকানোর জন্য তাদের গায়ে ছিল খুব লোম। এবং তাদের দাঁত আজকের হাতির দাঁতের
চেয়ে ছিল ঢের ঢের বড়। প্রত্নতত্ত্ববিদদের অনুমান, বাড়িটি তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছিল
অন্তত ৬০ টি ম্যামথের হাড়, দাঁত ও চামড়া।
গবেষণাটি করেছেন ইংল্যান্ডের এক্সেটার ইউনিভারসিটির প্রত্নতত্ত্ববিদ
আলেকজ্যান্ডার প্রায়োর। তাঁর গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘অ্যান্টিকুইটি’ জার্নালে।
বাড়িটি তৈরি করতে যে পরিমাণ ম্যামথের হাড় আর দাঁত জোগাড় করতে হয়েছিল, তা বেশ বিস্ময়কর।
এবং জোগাড় করা সেই সব হাড় ঠিক মতো কেটে, একটার সঙ্গে একটাকে জুড়ে একটা ৪০ ফিট চওড়া
বাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। সন্দেহ নেই সেকালে সেটা নিশ্চয়ই বেশ কঠিন আর সেই সঙ্গে সময় সাপেক্ষও
ছিল।
গবেষকদের ধারণা, কোনও এক বিশেষ কারণেই ওই হাড়ের বাড়ি তৈরি করেছিল
তুষার যুগের মানুষ। তা না হলে, অতটা পরিশ্রম করার কোনও প্রয়োজন ছিল না। ওই বাড়ির যা
অবশিষ্ট রয়েছে, তার মধ্যে পাওয়া গেছে কাঠকয়লা। পাইন আর স্প্রুস গাছের কাঠ থেকে যা তৈরি।
তার কার্বন ডেটিং করে দেখা গেছে, সেগুলি প্রায় ২৫,০০০ বছর আগেকার। ওই তথ্য থেকে প্রমান
হয়েছে যে, এখন যে সব গাছ আছে ওই অঞ্চলে, ২৫ হাজার বছর আগেও ওই প্রজাতিগুলি ছিল সেখানে।
আর পাওয়া গেছে কিছু খাবারের নমুনাও – গাজর, আলু, পারস্নিপের
টুকরো। এবং সেই সঙ্গে আবিষ্কার হয়েছে কয়েকটি গর্ত, যার মধ্যে রাখা ছিল ম্যামথের হাড়।
এর থেকে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে, ওই বাড়ি যারা ব্যবহার করত, তারা সবজিও খেত।
আর খেত প্রচুর পরিমাণে মাংস – ম্যামথের মাংস। এবং হাড়গুলো মজুত করে রাখত গর্তে।
কিন্তু গর্তে হাড় জমিয়ে রাখার কী কারণ থাকতে পারে? ওই বাড়ির
অবশেষের মধ্যে গবেষকরা খুঁজে পান বেশ কিছু পোড়া হাড়ের নমুনা। হ্যাঁ, ম্যামথের পোড়া
হাড়। মনে করা হচ্ছে, হাড় জ্বালানো হত আলোর জন্য। কাঠের আগুনের থেকে হাড়ের আগুনের তাপ
কম, কিন্তু আলো বেশি। এমনও বলা হয়েছে যে, ওই বাড়িতে সম্ভবত মাংস প্রক্রিয়াকরণের কাজ
করা হত। কারণ একটা ম্যামথ শিকার করলে, তার মাংস তো খেতে হত অনেক দিন ধরে। সে জন্য তা
ঠিক রাখার ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করতে হত। হয়তো কাজ চলত রাতেও। তাই হাড় পুড়িয়ে আলোকিত করা
হত ঘরটিকে।
তবে ম্যামথের হাড় আর চামড়া দিয়ে তৈরি ঘর পূর্ব ইউরোপের নানা
জায়গায় আগেই পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু সেগুলি ছিল ছোট, মাত্র কয়েক ফিট চওড়া তাঁবুর মত।
সেগুলিতে বসবাস করত মানুষ। এবং সেখানে আগুন জ্বালানোর নির্দিষ্ট স্থানও ছিল। সেখানে
পাওয়া যায় শেয়াল, ঘোড়া, রেইনডিয়ার –ইত্যাদির মতো নানান প্রাণীর দেহাবশেষও।
তবে সাইবেরিয়া ছাড়া ওই পেল্লায় আয়তনের ম্যামথ বাড়ির হদিস কিন্তু
এখনও পর্যন্ত আর কোথাও পাওয়া যায়নি।


Comments
Post a Comment