জিনের জাদু মানুষের শরীরে

 


প্রতিকূল পরিবেশ যে মানুষের শরীরকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা আমরা দেখতে পাই। বা ঘুরিয়ে বলা যেতে পারে যে, মানুষের শরীর পরিবেশের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য নিজের মধ্যে কিছু পরিবর্তন ঘটায়। তা না হলে, সেই সব অবস্থায় টিকে থাকা সম্ভব হতো না মানুষের পক্ষে।

সম্প্রতিআফ্রিকার একটি অঞ্চলের কথা জানা গেছে। কেনিয়ার উত্তরে অবস্থিত ওই এলাকা হলো অত্যন্ত রুক্ষ, শুষ্ক অঞ্চল। ফলে, সেখানে জলের খুব অভাব। সেখানে বাস করেন এক যাযাবর জনজাতি। প্রবল জলসঙ্কটের মধ্যেই দিন কাটে তাঁদের। কিন্তু সেই জায়গা ছেড়ে অন্যত্র কোথাও, যেখানে সহজে জল মেলে, সেখানে চলে যাননি তাঁরা।

কেনিয়ার ওই জায়গাটির নাম টুরকানা। ওই জনগোষ্ঠী (ছবি) টুরকানা নামেই পরিচিত। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কেনিয়ার গবেষকরা দেখেন যে, ওই জনজাতির মানুষেরা খুব কম পরিমাণ জল পান করা সত্ত্বেও জলাভাব দেখা দেয় না তাঁদের শরীরে। এক দিকে তাঁরা কম জল খান, আর অন্য দিকে তাঁদের আহারের একটা বড়ো অংশ জুড়ে থাকে প্রোটিন। সাধারণভাবে, গবেষকরা বলেন, এই অবস্থায় মানুষের কিডনি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে খুব বেশি। অথচ, টুরকানা জনজাতির সদস্যদের মধ্যে কিডনির অসুখ তেমন দেখা যায় না।

জিন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেন যে, তাঁদের শরীরে এক সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে গেছে। তার ফলে, কম জল ও প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন (মাংস, দুধ) খাওয়া সত্ত্বেও তাঁদের কিডনি সেই চাপ সহ্য করতে পারে। এবং প্রস্রাবের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে শরীরে জলের অনুপাত স্থিতিশীল রাখে। গবেষকদের মতে, ,৫০০ বছর আগে, কেনিয়ার টুরকানা অঞ্চল শুষ্ক হয়ে উঠতে শুরু করে, তখনই সেখানকার মানুষের মধ্যে একটি সুপ্ত জিন সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকে।

পূর্ব আফ্রিকার দাসানাচ নামের আরও এক জনজাতির মধ্যেও একই ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে, যদিও টুরকানাদের সঙ্গে তাদের কোনও মিশ্রণ ঘটিনি কখনও। তারাও বাস করে এক রুক্ষ অঞ্চলে। এবং সেই অঞ্চলেও ওই একই সময়ে ,৫০০ বছর আগে রুক্ষতা বাড়তে থাকে।

অথচ, যে টুরকানা জনগোষ্ঠীর মানুষরা শুষ্ক এলাকায় জলাভাবের মধ্যে সুস্থ থাকেন, শহরে বাস করতে শুরু করলেই তাঁদের শরীরে নানা ধরনের অসুখ বাসা বাঁধে বলে জানা গেছে। সেখানে জলের অভাব তেমন থাকে না। বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যকর অস্বাস্থ্যকর খাবার নাগালের মধ্যে চলে আসে। সেই সব খাবারের স্বাদের আকর্ষণ কাটানো হয় কঠিন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের হার্টের অসুখ দেখা দেয়। তাছাড়া, হজমের অসুবিধা, শরীরে অতিরিক্ত মেদ ও উচ্চ রক্তচাপেরও শিকার হয়ে পড়েন তাঁরা। জীববিজ্ঞানীরা বলেন, পরিবেশ ও জিনের ক্রিয়ার অসামঞ্জস্যতাই ওই ধরনের বিভ্রাট ডেকে আনে।

পরিবেশের সঙ্গে জিনের ক্রিয়াকলাপের বিকাশের আরও একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে, পাহাড়ের খুব উঁচুতে বসবাসকারীরা মানুষের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন, নেপালের শেরপা জনগোষ্ঠীর মানুষ ও তিব্বতের বাসিন্দারা কম অক্সিজেনের পরিবেশে স্বচ্ছন্দে বেঁচে থাকেন।


ইংল্যান্ডের কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলেছেন যে, প্রায় ৩০,০০০ বছর আগে, মানুষ তিব্বত উপত্যকায় পৌঁছে যায়। এবং ৯,০০০-৬,০০০ বছরের মধ্যে সেখানে স্থায়ী জনপদ গড়ে উঠতে শুরু করে। জিন বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেছেন যে, একদিকে তিব্বতের মানুষ ও নেপালের শেরপা জনগোষ্ঠী এবং অন্যদিকে অনুচ্চ এলাকার বাসিন্দাদের জিনে কিঞ্চিৎ তফাত রয়েছে। বলা হয়, ১৩,০০০ ফিট উচ্চতা থেকে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকে। ফলে, অক্সিজেনের অভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে ওই উচ্চতায় বা তারও ওপরে বসবাসকারীরা। সময়ের সঙ্গে, তাঁদের জিনের ক্রিয়ায় ঘটেছে সূক্ষ্ম পরিবর্তন। যা অক্সিজেনের অভাবকে তাঁদের কাছে করে তুলেছে সহনশীল।

দেখা যাচ্ছে, আফ্রিকার জলাভাব অথবা তিব্বত ও নেপালের সুউচ্চু পাহাড়ের বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতি, দুই ক্ষেত্রেই মানুষের জিন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিয়েছে। তাই কঠিন পরিবেশেও স্বচ্ছন্দ বোধ করেন সেখানকার মানুষ।

ছবি: উইকিপিডিয়া কমন্স 

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভালো হরমোন বাড়ায় কুকুর, বেড়াল

গাছেরা কি দেখতে পায়

অন্ধকারকে মানুষ ভয় পায় কেন