পৃথিবীর ভেতর আরও এক পৃথিবী
এক
সময়, প্রকৃতিই
ঠিক করত কে কেমন হবে, কে কী খাবে, কে কোথায় থাকবে। বিবর্তন নামক এক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে, সেই সব ব্যবস্থা করত। সবার সঙ্গে সবার
বন্ধন, পৃথিবীজুড়ে
প্রাণীদের মধ্যে এক সুস্থায়ী ভারসাম্য, এ সবই নিশ্চিত করত সে। এমনকি মানুষও
তার নিয়মের অধীনে ছিল এক কালে।
কিন্তু
এখন যেন বিবর্তনের ধারাটা মানুষই নির্ধারণ করছে। দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে, সেই এখন ঠিক করছে কে কোথায় থাকবে, কে কি খাবে, কে টিকে থাকবে, আর কেইবা মুছে যাবে এই গ্রহের বুক
থেকে। নিজের অজান্তেই সে আগামী দিনের পৃথিবী নির্মাণ করে চলেছে, যদিও তার রূপ কেমন হবে তা সে জানে না।
প্রযুক্তির নানা অগ্রগতি সত্ত্বেও, ভবিষ্যৎটা এখনো ছবির মতো পর্দায় ফুটিয়ে
তোলা সম্ভব হচ্ছে না। হয়ত হবে, কোনও একদিন।
বন্যরা
বনে সুন্দর, এমনই
একটা কথা এখনও প্রচলিত আছে। কিন্তু বন্যরা এখন আর বনে থাকছে না। তাদের অনেকেই আজ
শহরমুখী।
দিল্লিতে
বাঁদরের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তারা নাকি মানুষের খাবার প্লেট থেকে তুলে নিয়ে চম্পট দেয়। দিল্লির বাঁদরেরা অনেকেই আবার এসেছে শৈল শহর শিমলা থেকে। সেখানে তাদের
সংখ্যা ও উৎপাত এতটাই বেড়েছে, যে বেশ কিছুকে চালান করা হয়েছে রাজধানীতে। দিল্লি অনেক ছড়ানো শহর।
জায়গা বেশি।
মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে, কাঠবেড়ালির দলও এমনটাই করে। ভারতেরও অনেক জায়গায়, কাঠবেড়ালিরা মানুষের কাছাকাছি থাকে।
ছুঁড়ে দেওয়া বাদাম, বিস্কুট খায়।
অস্ট্রেলিয়ার
সিডনি শহরে এ ধরনের পাখি আছে। ইবেস তাদের নাম। তারা উচ্ছিষ্ট ফেলার ড্রাম থেকে
খাবার খুঁটে খায়। স্যান্ডউইচ নাকি তাদের বিশেষ প্রিয় খাবার হয়ে উঠেছে। কলকাতা
শহরেও চিলেরা অসতর্ক পথচারীর হাত থেকে খাবারের ঠোঙা ছোঁ মেরে নিয়ে যায়।
উপকূলের
সমুদ্রে যখন জাহাজ চলে, তখন তার পেছনে উড়তে থাকে অনেক সামুদ্রিক পাখি। জাহাজ চলায় জলে যে
আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তা অনেক মাছকে ওপরের দিকে নিয়ে আসে। পাখির ঝাঁক তখন জলে ডাইভ দিয়ে
সেই মাছ ধরে খায়। তারা জানে, জাহাজ গেলে খাবার মিলবে।
শীতের
সকালে, চাষের
খেতে ট্র্যাক্টর চললে, সাদা বকের দল তার সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে। ট্র্যাক্টর মাটি আলগা করতে
করতে এগলে, পোকামাকড়
সব বেরিয়ে আসে মাটির তলা থেকে। সেই সঙ্গে বকেরা সারে তাদের প্রাতভোজন।
ভারতে
ও শ্রীলঙ্কায় অনেক হাতি এখন নিয়ম করে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। আর চলমান গাড়ি
থামিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে তারা খাবার আদায় করে ছাড়ে।
ভারতের
বিভিন্ন তীর্থ ও পর্যটন শহরগুলিতে অনেক প্রাণীই এখন মানুষে দেওয়া বা তাদের কাছ
থেকে পাওয়া খাবার খেয়েই বাঁচে।
মেরু
অঞ্চলের শ্বেত ভল্লুক খাবারের সন্ধানে রাশিয়ার সাইবেরিয়ার এক শহরের আঁস্তাকুঁড়ে
ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন
মর্মান্তি ছবিও খবরের কাগজের পাতায় প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায়
দেখা গেছে, শহুরে
বন্য প্রাণীদের এই আচরণ বনে বসবাসকারী তাদের জ্ঞাতি থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। তাদের
চরিত্র এতটাই বদলে দিচ্ছে যে, তারা আর সহজে অরণ্যে বাস করতে পরবে না। সেখানে খাবার জোগাড় করতে যে
ক্ষমতা লাগে, শহরের
সান্নিধ্যে এসে তারা সেটি খুইয়েছে।
প্রতিটি
শহরের নিজস্ব চরিত্র থাকলেও, তাদের জীবনযাত্রার ছন্দে একটা মিল পাওয়া যায়, বলেছেন গবেষকরা। শহরের আবহাওয়া গ্রামের
তুলনায় উষ্ণ। সেখানে দূষণের মাত্রা বেশি। শব্দে গমগম করে শহরগুলি। আলোর ঝলকানিও
সেখানে চোখে পড়ার মতো। সেখানে খাবারও মেলে নানা ধরনের। এবং তার জোগানও বেশি।
‘সায়েন্স
অ্যালার্ট’-এ
প্রকাশিত একটি লেখায় বলা হয়েছে যে, শহরে বাস-করা প্রাণীরা বুঝে গেছে যে, মানুষের কাছ থেকে খাবার সংগ্রহ করা
সহজ। কম পরিশ্রম করতে হয়। এবং তারা এও দেখেছে, শহুরে মানুষের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার
সম্ভাবনাও কম।
ফলে, মানুষ সম্পর্কে তাদের ভীতি কেটে যেতে
শুরু করে এক সময়। তাই, একটু একটু করে তারা শহরেই আস্তানা গাড়ে। মানুষের মতো তারাও হয়ে ওঠে
নগরবাসী।
শহরের
পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে তারা। অনেক পাখি, ভোরের আলো ফোটার আগেই ডাকাডাকি শুরু
করে দেয়। অনেকে আবার তাদের বন্য সংস্করণের তুলনায়, অনেক উচ্চগ্রামে গলা সাধে।
গবেষকরা
বলছেন, শহরে
বসবাস-করা বন্য প্রাণীরা এতটাই বদলে যায় যে, তাদের বনে পুনর্বাসন আর কখনওই সম্ভব হয়
না। তারা ভুলে যায় কীভাবে খাবার জোগাড় করতে হয় জঙ্গলে। তাদের ডাক যায় পালটে। ফলে, সমগোত্রীয়দের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে
পারে না তারা। বনে থাকা কালে যে সব শিক্ষা তারা পায়, শহরের জীবন ধারায় তাদের আয়ত্ত করতে হয়
এক অন্য পাঠ্যক্রম। যা বন্য জীবনের পক্ষে একেবারেই অনুপোযোগী। তারা এখন এক অন্য
জগতের প্রাণী।
মানুষের
কর্মকাণ্ড, তার
প্রভাবে তৈরি পরিবেশ, বদলে দিচ্ছে প্রাণীদের। বিবর্তনের চাবি কি তাহলে এখন মানুষেরই হাতে?
ছবি নিজস্ব

Comments
Post a Comment