ভারতজুড়ে আগ্রাসী গাছের হামলা


ল্যান্টানা কামারা

একে বিদেশি, তার ওপর আগ্রাসী। হ্যাঁ, আগ্রাসী ধরনের বিদেশি গাছ ভারতের ১৫,০০০ বর্গ কিলোমিটার প্রাকৃতিক ভূমি দখল করে নিচ্ছে প্রতি বছর। গবেষণা থেকে তেমনটাই জানা যাচ্ছে। 

এই গাছগুলি হলো ল্যান্টানা কামারা’ (পুটুস), ‘ক্রোমোলায়েনা ওডোরাটা’ (তিভরা গন্ধা) ও প্রোসোপিস জুলিফ্লোরা’ (বিলিতি বাবলা)। ইতি মধ্যেই তারা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের প্রায় তিন ভাগের দু ভাগ এলাকাতেই আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

তিনটি গাছই ইংরেজরা ১৮০০ শতকের বিভিন্ন সময় ভারতে নিয়ে এসে ছিলেন। তিনটিই এসেছিল মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে। সুন্দর দেখতে বলে, প্রথম দুটিকে তাঁরা নিয়ে আসেন বাগানের শোভা বাড়তে। এবং বিলিতি বাবলাকে তাঁরা আনেন মরুভূমির বিস্তার ঠেকানোর কাজে লাগানোর উদ্দেশে। এখন তারা ভারতের প্রকৃতিতে এক বড়ো আকারের হুমকি হয়ে উঠেছে।

বলা হচ্ছে, প্রায় ১৪ কোটি মানুষসহ, বহু কৃষিজমি ও বন্যপ্রাণীদের বাসস্থান ওই গাছেদের আগ্রাসনের সম্মুখীন আজ। এবং আবহাওয়া পরিবর্তন তাদের আগ্রাসী ভাব ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে। নেচার সাসটেনিবিলিটিজার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে এই কথা বলা হয়েছে। ডেনমার্কের আরহুস ইউনিভার্সিটি, ভারতের ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া ও বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস-এর যৌথ গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

ভারতব্যাপী সমীক্ষা চালানোর পর, গবেষকরা জানিয়েছেন যে, ওই ভিনদেশি আগ্রাসী গাছগুলি ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। তারা ভারতের প্রাকৃতিক ভূমির চরিত্র দ্রুত পালটে দিচ্ছে। সেই জায়গাগুলি আগে যেমনটি ছিল, এখন আর তেমনটি থাকছে না। সেখানকার নিজস্ব গাছপালা পেছু হটছে। সেখানকার প্রাণীরাও সংকটে পড়ছে। এমনকি পশ্চিমঘাট পর্বতমালা, হিমালয় ও উত্তরপূর্বঞ্চলের মতো পরিবেশের দিক থেকে স্পর্শকাতর অঞ্চলেও তারা তাদের এলাকা ইতিমধ্যেই দ্বিগুণ করে ফেলেছে বলে গবেষণা থেকে জানা গেছে।

গবেষকরা বলেছেন, ওই আগ্রাসী গাছগুলি ক্রমশ জমি দখল করতে থাকায়, মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও তার প্রভাব পড়ছে। যে সব মানুষ ও জনগোষ্ঠী প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে জীবন যাপন করেন, তাঁদের জীবনযাত্রাকেও বিপন্ন করে তুলছে ওই গাছেদের আগ্রাসন। দেখা গেছে, ২০০৬ থেকে শুরু করে ২০২২ পর্যন্ত, ১৪ কোটিরও কিছু বেশি মানুষ, প্রায় ২৮ লক্ষ গৃহপালিত পশু ও ২,০০,০০০ বর্গ কিমি চাষের ছোট জমি ওই তিনটি গাছের কোনও না কোনও একটির আগ্রাসনের সম্মুখীন।

দেখা গেছে, তিভরা গন্ধা গাছটির বিস্তার সবচেয়ে দ্রুত ঘটছে। বছরে প্রায় ২,০০০ বর্গ কিমি জায়গায় তারা তাদের আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে।

অন্য গাছগুলিও পিছিয়ে নেই। বিদেশি বাবলা এ দেশে আনা হয়েছিল মরুভূমির অগ্রসর রোধ করার জন্য। কিন্তু আজ তারা সমগ্র শুষ্ক অঞ্চলেই ছড়িয়ে পড়েছে। তারা সরিয়ে দিচ্ছে সেই সব অঞ্চলের স্থানীয় ঘাস ও ঝোপঝাড়, যেগুলি সেখানকার বন্যপ্রাণী ও পশুপালকদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। ওই গাছের বাড়বাড়ন্ত দেখা যায় অনেক জায়গায়। যেমন, দিল্লি শহরের উপকণ্ঠে। সেখানে গড়ে উঠেছে বিলিতি বাবলার বন।

ভারতে এখন ১১ প্রজাতির আগ্রাসী গাছের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছে এই তিনটে প্রধান আগ্রাসী প্রজাতি। তাদের অনেকগুলিকে এক সময় শুষ্ক এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে ধরে নেওয়া হত। এখন কিন্তু তারা শুষ্ক তৃণভূমি ছাড়াও, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের আর্দ্র তৃণভূমিতেও ছড়িয়ে পড়ছে। এবং পশ্চিমঘাট পর্বতমালাতেও তাদের উপস্থিতি এখন বেশ লক্ষণীয়।

গবেষণা পত্রের মুখ্য লেখক নিনাদ মুঙ্গি বলেছেন, “এই হারে তাদের বৃদ্ধি হতে থাকলে, এক প্রজন্মের মধ্যেই আগ্রাসী প্রজাতিগুলি সব বাস্তুতন্ত্রের ওপর তাদের আধিপত্য কায়েম করে ফেলবে। হটিয়ে দেবে স্থানীয়দের। তারা এত দ্রুত ছড়াচ্ছে যে, তাদের আয়ত্তে রাখা বা তাদের ওপর নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না।

গবেষকরা বলেছেন, আগ্রাসী গাছেদের বিস্তারকে উস্কে দিচ্ছে আবহাওয়া পরিবর্তন। কিছু প্রজাতির বিস্তার ঘটছে সেই সব জায়গায় যেখানে উষ্ণায়নের ফলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় রুক্ষ হয়ে উঠছে মাটি। আবার কিছু প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ছে সেই সব অঞ্চলে যেখানে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাড়ছে মাটির আর্দ্রতা।

এই বিস্তারের ফলে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অনেক মানুষ, বিশেষ করে যাঁরা কৃষিকাজ ও পশুপালন করেন। এই গাছগুলি চাষের জমির উর্বরতা কমিয়ে দেয়। এবং সেগুলিকে সাফ করতে চাষিদের কাজ ও খরচ দুইই বেড়ে যায়। আবার, বনে ও চারণভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে, তৃণভোজী প্রাণীদের খাদ্যের ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই গাছগুলি। ফলে, পশুপালকদের আলাদা করে খাবার কিনতে হয় তাঁদের পোষ্যদের জন্য। গবেষকরা হিসেব করে দেখেছেন যে, ১৯৬০ থেকে ২০২০র মধ্যে আগ্রাসী গাছের দরুন ভারতের লোকসান হয়েছে ৮,৩০,০০০ কোটি টাকা!

ছবি নিজস্ব

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস