শরীর কতটা ঠান্ডা হলেও বাঁচা যায়
৯৮.৬
ডিগ্রি ফ্যারেনহাইট। এটাই মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা। এর বেশি হলেই, আমরা জ্বরের কবলে পড়ি। ডাক্তারবাবু
আসেন। ওষুধ খেতে হয়। শরীর তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে গেলে, আমরা আবার সুস্থ বোধ করি। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার অসুখে আমরা
সকলেই কোনও না কোনও সময় আক্রান্ত হই। জ্বরে পড়েনি এমন মানুষ পৃথিবীতে নেই বললেই
চলে। কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার মতো ঘটনা আমাদের ক’জনেরই বা জীবনে ঘটেছে!
বাইরের
তাপমাত্রা যাই হোক না কেন,
মানুষের শরীরের তাপ ওই ৯৮.৬ ডিগ্রি
ফ্যারেনহাইটেই বাঁধা থাকে। কিন্তু শীতের দিনে, কনকনে ঠান্ডায়, ‘ঠান্ডা’ লেগে কিন্তু শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে
যায়। মানে, জ্বর হয়। আবার গ্রীষ্মকালে, ‘গরম’ লেগে গেলেও কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। শরীরের মতিগতি এমনই বিচিত্র।
কিন্তু
বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে শরীরের তাপমাত্রা কমেও যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা ৯৫ ডিগ্রি বা তার নীচে নেমে
গেলে, সেই পরিস্থিতিকে ‘তাপের-ঘাটিতি’ বলে চিহ্নিত করা হয়। খুব ঠান্ডা
পরিবেশে, আমাদের শরীরে কাঁপুনি দেয়। সেটা শরীরকে
গরম রাখার উপায়। কিন্তু পরিস্থিতি তেমন বিরূপ হলে, আমাদের বাইরের পোষাক পরিচ্ছেদ ও তাপ ধরে রাখার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা, সবই অকেজো হয়ে যায়। তখন শরীরে তাপ কমতে
থাকে। যা প্রাণহানিকরও হয়ে উঠতে পারে। আবার এও ঠিক যে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে, শরীরের তাপমাত্রা নেমে গেলে, তা অপকার করার বদলে উপকারই করে।
তাপমাত্রা
৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট থেকে ৮৯.৬ ডিগ্রির মধ্যে থাকলে, অনেকের খিদে পায়, শরীর
খারাপ লাগে, ত্বক ফ্যাকাশে ও শুকনো দেখায়।
৮৯.৬
ডিগ্রির নীচে নেমে গেলে, রোগী ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তার হৃদ্যন্ত্র
চলার ও শ্বাস-প্রশ্বাসের হার কমে যায়। তাছাড়া, শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
সত্ত্বেও, রোগী তার জামাকাপড় খুলে ফেলতে চায়।
আর
তাপমাত্রা ৮২.৪ ডিগ্রি ফ্যারেনহাইটে নেমে গিয়ে অতিশয় তাপ-ঘাটতি সৃষ্টি করলে, পরিস্থিতি বেশ সংকটময় হয়ে ওঠে - রক্তচাপ কমে যায়, হৃৎস্পন্দন
আরও কমতে থাকে।
কিন্তু
মানুষের শরীরে সার্জারি করার সময়, চিকিৎসকরা
অনেক ক্ষেত্রে রোগীর শরীরের তাপ কৃত্রিম উপায়ে কমিয়ে দেন। জানা যাচ্ছে যে, হার্ট ও ব্রেন অপারেশনের সময় চিকিৎসকরা
রোগীর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই নীচে নামিয়ে দেন। তার ফলে, অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি সুরক্ষীত
থাকে। এবং একজন শল্যচিকিৎসক হাতে অনেকটা সময় পান। ১৯৬১ সালে, একটি অপারেশনের সময়, রোগীর শরীরের তাপমাত্রা ৩৯.৬ ডিগ্রি
ফ্যারেনহাইটে নামিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর চিকিৎসক। তা সত্ত্বেও রোগী সম্পূর্ণ
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান। সেই রেকর্ড আজও ভাঙেনি।
কৃত্রিম
উপায়ে, চিকিৎসার স্বার্থে, শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনা এক জিনিস, আর দুর্ঘটনার কবলে পড়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে
যাওয়া আর এক। দ্বিতীয়টিতে,
তা মারাত্মক হতে পারে। ১৯৯৯-তে, সুইডেনের একজন রেডিওলজিস্ট, অ্যানা বাগেনহোম, পাহাড়ে স্কি করার সময়, বরফের পুরু চাদর ভেদ করে এক গর্তের
মধ্যে ছিটকে পড়েন। সেখান থেকে বেরোতে পারেন নি। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে তাঁর শরীরে
ওপর দিয়ে বয়ে যায় বরফগলা ঠান্ডা জল। উদ্ধারকারীরা যখন পৌঁছন, অ্যানা ততক্ষণে প্রায় মৃত।
হাসপাতালে
এক মাস তাঁকে ভেন্টিলেটারে রাখা হয়। তাঁর রক্তে সমস্যা দেখা দেয়। স্নায়ুতন্ত্র
ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলি ঠিক ভাবে কাজ করে না। কিন্তু পাঁচ
মাসের চিকিৎসার পর উনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। কাজে যোগ দেন। এবং হেঁটে হেঁটে বেড়াতে শুরু
করেন।
ছবি: নিজস্ব

Comments
Post a Comment