১২ উদ্ভিদ, ৫ প্রাণীই মানুষের প্রধান খাদ্যদাতা



আমাদের খাবারের প্রায় সবটাই আসে প্রকৃতি থেকে। চাল, গম, ডাল, নুন, তেল, সবজি, মাছ, মাংস, ফল সবই তো প্রকৃতি তৈরি করে। সার দিয়ে, সেচের জল জুগিয়ে, পোকা মেরে, ক্ষতিকর ছত্রাকের বিরুদ্ধে ওষুধ প্রয়োগ করে আমরা সেই কাজে সহায়তা করি মাত্র। বড় বড় কলকারখানায় মেশিন চালালেই চাল-গম, আলু-পটল, আম-জাম, রুই-কাতলা, মুর্র্গি-মটন হুড় হুড় করে বেরিয়ে আসছে, এমনটা ঘটে না। সেই দিন এখনও আসেনি। প্রকৃতির ভাণ্ডারে সবই মজুত আছে। চাষীরা মাঠে চাষ করেন, পশুপালকরা নানা প্রাণী পালন করেন, আর ফল চাষীরা ফলের বাগান তৈরি করেন বলেই আমরা খেতে পাই।

রাষ্ট্রসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, মানুষের ৭৫ শতাংশ খাদ্য আসে ১২টি উদ্ভিদ ও পাঁচটি প্রাণী থেকে। প্রায় ৩০,০০০ উদ্ভিদ খাওয়ার যোগ্য। কিন্তু তাদের মধ্যে মানুষের খাদ্য তালিকায় রয়েছে মাত্র ১৫০টি। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের খাদ্যে হয়তো আরও অনেক বিচিত্র বস্তু থাকে যেগুলিকে এই তালিকার জন্য বিবেচনা করা হয়নি। কিন্তু মানুষে খাদ্যে যে বৈচিত্র্য তা ক্রমশ কমে আসছে। যেমন, একটা সূত্র বলছে, ভারতে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত নাকি ১,১০,০০০ ধরনের চাল উৎপন্ন হত। এখন সংখ্যাটা কমে হয়েছে ৬,০০০। তার মধ্যে, প্রতিদিন খাওয়া হয় এমন চালের সংখ্যা হাতে গোনা যায়। এক সময়, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে হাজারও ধরনের সবজি খাওয়ার চল ছিল। এখন এক শ্রেণির মানুষ সেগুলি খেতে ভুলে গেছেন। বাজারেও এখন সেগুলির জোগানও কম। দেখা গেছে, কলকাতার সল্টলেকের মতো জায়গায়, গাছ ভর্তি সোজনে ডাঁটা ঝুলে থাকলেও খাওয়ার লোক পাওয়া যায় না। সজনে ফুল মাটিতে ঝরে পড়ে নষ্ট হয়। সুযোগ পেলেই কেটে ফেলা হয় ওই গাছের ডালপালা। কারণ, সজনে গাছে নাকি খুব শুঁয়োপোকা হয়, যা একদিন ডানা মেলে উড়ে যায় প্রজাপতিতে হয়ে। সর্বত্রই খাদ্যের বৈচিত্র্য কমছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯০০ সালে পর থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ৯০ শতাংশ ফল ও শাকসবজি। এমনটাই বলা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান-এর এক গবেষণায়

একদিকে যখন বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের বৈচিত্র্য কমছে, তখন আবার এও দেখা যাচ্ছে যে, চাষের খেতের সংখ্যা কমছে কিন্তু একই সঙ্গে তাদের আয়তন বাড়ছে। অর্থাৎ, ছোট ছোট খেতে নানা ধরনের ফসল ফলানর বদলে অনেক বড় খেতে একই ধরনের ফসল বোনার প্রবণতা বাড়ছে বিশ্বজুড়ে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো বোল্ডার-এর এক গবেষণায়, ১৯৬৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ১৮০ দেশের চাষের খেতের আয়তন খতিয়ে দেখা হয়। ওই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে, ভবিষ্যৎটা কেমন হবে তার একটা আভাস দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ২১০০ সাল নাগাদ, চষের খেতের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক হয়ে যাবে, আর আয়তন হবে দ্বিগুণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়োরোপে এই প্রবণতা অনেক দিন ধরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলেও এমনটা দেখা দিতে শুরু করেছে।

এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকায় বেশিরভাগ মানুষ এখনও চাষাবাদ করেই জীবনধারণ করেন। কিন্তু চাষের খেতের আয়তন বৃদ্ধি ও সংখ্যা হ্রাস মানে সেখানে ব্যবহার হবে বড় বড় যন্ত্র। সেগুলি অনেক কাজ একাই করে দেবে। সেগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা চালিত হবে, এমনটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া জিন প্রযুক্তির দৌলতে সৃষ্টি হবে শংকর প্রজাতির বহু গাছপালা, যেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন হবে নতুন ধরনের দক্ষতা। ওই সব বড় বড় খেতে ফলবে একই ধরনের ফসল। গম তো গম। ভুট্টা তো ভুট্টাই, আলু তো অলুই। সূর্যমুখী ফুল তো আর কিছুই নয়। তার ফলে খাদ্যের বৈচিত্র্য কমবে।

খাদ্য বৈচিত্র্য কমে গেলে মানুষের খাদ্য তালিকায় খাদ্যের সংখ্যা কমবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের খাদ্য সুরক্ষায় ঘাটতি দেখা দেবে। সেই সঙ্গে তা অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও সংকট সৃষ্টি করবে। কারণ, যুগ যুগ ধরে, মানুষের উৎপন্ন খাদ্য ভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে আসছে বহু প্রাণীও।

ভারতে ছবিটা এখনও অন্য রকম। এখানে এখনও চাষের খেত ভাগ হতে হতে ছোট থেকে আরও ছোট হয়ে চলেছে। সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু ফলন হচ্ছে কম। বিশ্বের প্রবণতার সঙ্গে কি ভারতও পায়ে পা মিলিয়ে বড় খামার তৈরি করার দিকে এগোবে? এ দেশের ক্ষেত্রে তার পরিণাম কী হতে পারে তা এখনও স্পষ্ট নয়।

ছবি: অনীশ গুপ্ত


Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস