আখ খেতের চিতাবাঘ
বদলাতে
থাকা পৃথিবীতে, প্রাণীরাও তাঁদের স্বভাব ও আচরণ
বদলানোর চেষ্টা করে। বেঁচে থাকার তাগিদেই তাঁরা এমনটা করে বলে ধরে নেওয়া যায়। নতুন
পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারলেই টিকে থাকা সম্ভব। নচেৎ, জীবন সংকট বাড়তে বাড়তে, অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলতে পারে। নয়
বদল, নয় বিনাশ। বিবর্তনের নিয়ম এমনই
অনমনীয়।
এই
রকমই এক প্রাণীর কথা সম্প্রতি জানা গেছে। তাঁরা ভারতের মহারাষ্ট্র প্রদেশের
লেপার্ড বা চিতাবাঘ। মানুষ তাদের ভয় পায়। ভয় পাওয়ারই কথা । চিতাবাঘ বড়
বাঘেদের মধ্যে পড়ে। আর বাঘেদের কে না ভয় পায়! তবে, তারাও মানুষকে এড়িয়ে চলে যতটা সম্ভব।
দু পায়, সোজা হয়ে চলা জীবটিকে ভয় পায় না এমন
প্রাণী কমই আছে। এমনকি মানুষও মানুষকে ভয় পায়।
মহারাষ্ট্রের
জুন্নার-এ চিতাবাঘের এক বড় বাসস্থান রয়েছে। কিন্তু সেটি কোনও জঙ্গল নয়। সেখানে এক
বিরাট এলাকাজুড়ে আখের চাষ হয়। মাইলের পর মাইল শুধুই আখের খেত। সেই খেতেই থাকে
চিতাবাঘরা। কয়েক প্রজন্ম ধরে চিতাবাঘেরা সেখানেই আছে। তারা কোনও দিন জঙ্গল দেখেনি।
আখের খেতে থাকে বলে, জুন্নারের বন আধিকারিকরা তাদের বলেন ‘সুগার বেবি’।বা ‘চিনি-শিশু’। এমনটাই জানা গেছে টাইমস অফ ইন্ডিয়ারএক প্রতিবেদন থেকে।
এখানে
চিতাবাঘের বাচ্চাদের জন্য এক অন্য পাঠ্যক্রম চালু করেছে তাদের মায়েরা। ছোট থেকে
তারা শেখে কী করে ট্র্যাক্টর, সেচ
ব্যবস্থা ও মানুষের আনাগোনার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। ফলে, মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে তারা বেশ
অভ্যস্ত। মানুষকে তারা দেখে তাদের বাসস্থানের অঙ্গ হিসেবে। যেমন, জঙ্গলের চিতাবাঘেরা বাঁদর বা
শিম্পাঞ্জিদের তাদের বাসস্থানের অংশীদার বলে মনে করে। ফলে মানুষের সঙ্গে
সহ-অবস্থান করার নিয়ম কানুন রপ্ত করে ফেলেছে জুন্নারের সুগার বেবিরা।
সেখানকার
বন আধিকারিকরা বলেন, আখের খেত থেকে চিতাবাঘদের সরিয়ে দেওয়ার
চেষ্টা বার বার ব্যর্থ হয়েছে। তাদের দূরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে এলেও, কয়েক দিনের মধ্যেই তারা আবার নিজের
জায়গায় ফিরে আসে। পটকা ফাটিয়ে বা টিনের খালি কৌটো বাজিয়েও লাভ হয় না। চিতাবাঘের
সাবকরা সেই সব যাওয়াও শুনতে শুনতেই বড় হয়ে ওঠে। ওই আওয়াজ শুনতে তারা অভ্যস্ত।
ইতিমধ্যেই কয়েকটি প্রজন্ম আখের খেতে জন্মেছে ও বড় হয়েছে।
তারা
আখের খেতে বাস করে এমন জীবজন্তু শিকার করে। গ্রাম থেকে ছাগলটা মুরগিটা ধরে আনে।
কিন্তু মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে তারা জড়ায় না সচরাচর। অন্যদিকে, চিতাবাঘের সঙ্গে কীভাবে সহাবস্থান করা
যায়, সে ব্যাপারে গ্রামবাসীদের সচেতন করার
কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বন দফতর।
তবে
সমস্যা দেখা দেয় নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে, যখন আখ কাটার সময় আসে। সেই সময় আখের খেতে মানুষের আনাগুনা বেড়ে যায়।
বাড়ে কাটা আখ নিয়ে যাওয়ার জন্য ট্র্যাক্টারের আসা যাওয়াও। তখন, অনেক সময়, মায়েরা তাদের বাচ্চাদের ফেলে নিরাপদ
কোনও জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু মাকে ছাড়া বাচ্চাদের বাঁচার সম্ভাবনা প্রায়
থাকে না বললেই চলে। মায়ের শরীরের উষ্ণতা ও মায়ের দুধ না পেলে তারা সংকটাপন্ন হয়ে
পড়ে। সংক্চুয়ারি ফাউন্ডেশনের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, সেই সময়ে, বন দফতর ও একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন
বাচ্চাদের বাঁচানর কাজে নেমে পড়ে।
জানা
গেছে, তাদের কোনও রেসকিউ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া
হয় না। মনে করা হয়, তাসের অন্যত্র নিয়ে চলে গেলে, পরে তাসের পুনর্বাসনে সমস্যা দেখা দিতে
পারে। তাই, পশু চিকিৎসক ও তাঁর সহকারীরা পরিত্যক্ত
বাচ্চাদের কাছে পৌঁছে যান ও সেখানেই তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। দেওয়া হয়
প্রয়োজনীয় খাবার, জল ও ওষুধ। আখের পাতা দিয়ে তৈরি করা হয়
আচ্ছাদন। সেখানেই তারা থাকে। আর দূরে বসে অপেক্ষা করেন বনকর্মী ও চিকিৎসকের দল।
বাচ্চারা একটু চাঙ্গা হয়ে উঠলেই, তারা
তাদের মিহি গলায় ডাকতে শুরু করে। আর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে, মা তাদের কাছে খুব সন্তর্পণে পৌঁছে
যায়। মায়ের সঙ্গে মিলন ঘটলেই ফিরে যান বনকর্মী ও চিকিৎসকের দল।
এমনি করেই জুন্নারের আখের খেতে চলতে থাকে চিতাবাঘদের জীবনচক্র।
ছবি: উইকিপিডিয়া কমন্স

Comments
Post a Comment