প্রাণীদের চলাফেরার জায়গা কমছে
মানুষের
সংখ্যা বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। কোনও কোনও দেশের জনসংখ্যা কমলেও, সারা পৃথিবীতে মানুষ বাড়ছে।
রাষ্ট্রসঙ্ঘ জানিয়েছে, জুন ২০২৫-এর হিসেব অনুযায়ী, পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮২০ কোটি।
মানুষ
বাড়ছে, কিন্তু পৃথিবীর আয়তন এক বর্গ ইঞ্চিও
বাড়ছে না। একই থাকছে। বাড়ছেও না, কমছেও
না। এই অবস্থায়, পৃথিবীর মোট আয়তনের একটি উল্লেখযোগ্য
অংশ চলে যাচ্ছে বাড়তে-থাকা মানুষের জন্য জায়গা করে দিতে। এবং সেই অংশটা দিন দিন
বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ, মানুষ বেড়েই চলেছে।
মানুষ
যখন বেশি জায়গা দখল করে নিচ্ছে, তখন, স্বাভাবিক ভাবেই, পৃথিবীতে অন্যান্য সব প্রাণীদের জন্য
জায়গা কমছে। গাছপালা, পোকামাকড় ও পশুপখির বাসস্থান ও ঘুরে
বেড়ানর ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে ক্রমশ।
প্রাণী
মাত্রই ঘুরে বেড়ায়। পোকারা বেড়ায়। পাখিরা বেড়ায়। বাঘ, সিংহ, হাতি, ঘোড়া, বেড়াল, কুকুর কেউই এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে না। এমনকি গাছেরাও চলাচল করে এক
অর্থে। বীজ থেকে অঙ্কুরিত হয়ে, আলোর
সন্ধানে তারা ওপর দিকে উঠতে থাকে। একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ে তাদের ডালপালা। মাটির
তলায়, এক অন্ধকার, রহস্যময় জগতের মধ্যে দিয়ে ধীর গতিতে
এগিয়ে চলে তাদের শেকড়বাকড়।
এক
সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, পৃথিবীজুড়ে,
মানুষ ছাড়া, জীবজগতের অন্যান্য প্রাণীদের চলাফেরা
কমছে। তুলনায়, মানুষের বাড়ছে। অর্থাৎ, মানুষ বাদে, পৃথিবীর বায়োমাস বা জীব সমষ্টির
বিচরণের হার কমে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালটেক ল্যাব ও ইজরায়েলের ওয়াইজমান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স’র যৌথ গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রাণীদের
চলাফেরা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য খুবই জরুরি। তাদের বিচরণ জমিতে সার
জোগায়, বীজ ছড়াতে সাহায্য করে, খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক ঠিক রাখে এবং
জিনের আদান প্রদানের মাধ্যমে প্রতিটি প্রজাতির স্বাস্থ্য বজায় রাখে। ফলে, তাদের চলাফেরার বিস্তার ও হার কমে গেলে, নানা ধরনের প্রাকৃতিক সমস্যা দেখ দিতে
পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন গবেষকরা।
দেখা
গেছে, সর্বত্রই, মানুষের কর্মকাণ্ড প্রাণীদের বিচরণ
ক্ষেত্রকে সীমিত, বিক্ষিপ্ত অথবা বিলুপ্ত করে দিচ্ছে। এক
সময় যেখানে ছিল জঙ্গল, খালবিল, জংলাভূমি, জলাভূমি বা ঘাসে ঢাকা উন্মুক্ত
প্রান্তর, সেই রকম অনেক জায়গাই আজ আর নেই।
সেগুলিকে গ্রাস করেছে শহরের বিস্তার, কলকারখানা, প্রশস্ত রাস্তা। কোথাও আবার নদীর বুকে
তৈরি হয়েছে বাঁধ, আর তার জলাধারের বিপুল জলে তলিয়ে গেছে
প্রাণীদের অনাবৃত বাসস্থান অথবা বিচরণভূমি।
যেমন, এক সময় সুন্দরবন ছিল আজকের তুলনায় অনেক
বড়। আজ যেখানে বসতি, গ্রাম ও গঞ্জ গড়ে উঠেছে, সেখানে এক কালে ছিল বাঘ আর হরিণদের
নিত্য আনাগোনা। কিন্তু সেই গাছেদের জড়াজড়ি করে থাকা বন সাফ হয়ে গেছে অনেক দিন। এখন
সেই বনের প্রাণীরা অনেকটা ছোট এক সুন্দরবনে বাস করে। কলকাতার উপনগরী লবনহ্রদ-এ, ২৫-৩০ বছর আগেও মাঝ রাতে শেয়ালের ডাক
শোনা যেত। এখন আর যায় না। বিগত তিন দশকে, ওই নগরীর সব ফাঁকা জায়গা নির্মাণে ভরে গেছে। সেখানে আর কাশের বনে ডেউ
খেলে না শরতের বাতাসে। কাশ ফুলের মতো শেয়ালরাও বিলুপ্ত হয়েছে সেখান থেকে।
প্রাণীদের সংখ্যা কমছে। কমছে তাদের ঘুরেবেড়ানর জায়গা। অন্যদিকে, মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে তাদের ঘোরার জায়গাও। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর স্থলের সব জীবজন্তু, পাখি ও পোকামাকড়, এক বছরে, মিলিত ভাবে, যতটা ঘোরাফেরা করে, মানুষের ঘুরেবেড়নর বহর তার চেয়ে ৪০ গুণ বেশি। পৃথিবীর ৮২০ কোটি জনসংখ্যার প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন নানা ভাবে চলাচল করে -- পায়ে হেঁটে, কোনও না কোনও প্রাণীর টানা বাহনে, সাইকেলে, গাড়িতে, ট্রেনে অথবা প্লেনে। কেউ যান কাছেপিঠে, কেউ বা অনেক দূরে। গবেষকরা বলছেন, মাথাপিছু মানুষ গড়ে প্রতিদিন গড়ে ১৯ মাইল বা ৩০.৫৭ কিমি চলাচল করে।
গবেষণায়
এও দেখা গেছে যে, ৬৫ শতাংশ মানুষ গাড়ি-জাতীয় যানবাহন ও
মোটরসাইকেলে যাওয়া আসা করেন। দশ শতাংশ চলেন উড়োজাহাজে। পাঁচ শতাংশ ব্যবহার করেন
ট্রেন। এবং ২০ শতাংশ চলেন হেঁটে ও সাইকেলে। জলযানের কিন্তু কোনও উল্লেখ করেননি
গবেষকরা। সম্ভবত স্থলভাগের প্রাণীদের নিয়েই তাঁদের হিসেব-নিকেশ, সেই কারণেই।
ছবি: এআই’র তৈরি

Comments
Post a Comment