জীবাশ্মের এক বিরাট খনি ভারত
ভারত
একটি প্রাচীন দেশ, এটা নতুন কথা নয়। ভারতের প্রাচীনত্ব
সম্পর্কে আমরা সকলেই কম-বেশি জানি। প্রাচীন ভারতবর্ষ যে এক আরও প্রাচীন ভূখণ্ডের
ওপর অবস্থিত, সে কথাও বোধহয় অনেকের জানা। কিন্তু এই
প্রাচীন ভারতের প্রাচীনতর ভূখণ্ডে কী কী অতি প্রাচীন প্রাণী ঘুরে বেড়াত, আমরা তা বিশেষ জানি না। তবে
প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন,
ভারত হচ্ছে অমূল্য জীবাশ্মের এক বিরাট
খনি, যার ধনসম্পদ এখনও মাটির তলায় চাপা পড়ে
আছে।
তারা
বলছেন, এই ভূখণ্ড এক সময় ছিল ছোট-বড় নানা
জাতের ডাইনোসরদের স্বর্গরাজ্য। এখানে বাস করত নানান ধরনের প্রকাণ্ড সব সরীসৃপ।
এমনকি আজকের তিমিদের বহু যুগ আগের পূর্বজেরাও নাকি থাকত ভারতকে ঘিরে থাকা সমুদ্রের
জলে। মনে করা হচ্ছে, অতীতের নানা সাক্ষ্যবহনকারী সেই সব
জীবাশ্ম যদি এক এক করে মাটির তলা থেকে দিনের আলোয় উঠে আসে, তা হলে প্রাগৈতিহাসিক কালে পৃথিবীর
বুকে প্রাণীদের আবির্ভাব ও বিলুপ্তির গল্পটা হয়তো অন্যভাবে লিখতে হতে পারে।
২০০০
সালে, মহারাষ্ট্রের নাগপুরে কেন্দ্রীয় যাদুঘর
ঘুরে দেখছিলেন জীবাশ্মবিদ জেফ্রি উইলসন। জীবনে অনেক জীবাশ্মের নমুনা ঘেঁটে
দেখেছিলেন তিনি, কিন্তু নাগপুরের মিউজিয়ামে রাখা একটি
নমুনা দেখে তাক লেগে গিয়েছিল তাঁর। তাঁরই এক সহকর্মী সেটি আবিষ্কার করেছিলেন ১৯৮৪
সালে। সেটি পাওয়া গিয়েছিল গুজরাট রাজ্যের ধোলিডুংরি নামের এক গ্রামে।
কী
ছিল সেই জীবাশ্মে, যা বিস্মিত করেছিল উইলসনের মতো এক
অভিজ্ঞ গবেষককে? বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক উইলসন বলেন, “জীবনে সেই প্রথম, আমি ওই জীবাশ্মের মধ্যে একটি ডাইনোসরের
বাচ্চা ও তার পাশে ডাইনোসরের ডিম, একসঙ্গে
দেখতে পাই।” দৃশ্যটি অতি বিরল ছিল, সন্দেহ নেই।
কিন্তু
সেখানেই শেষ নয়। আরও কিছু তাঁর নজরে আসে। নমুনাটির মধ্যে ডাইনোসরের ছানা ও ডিম
ছাড়াও একটি বিশেষ হাড়ের অবশেষ তাঁর নজর কাড়ে। কিসের হাড় সেটি? যেটি কোনও এক ডাইনোসরের ডিম ও বাচ্চাসহ
পাথরে পরিণত হয়ে, কোটি কোটি বছর ধরে রয়ে গিয়েছিল ভারতের
এক গ্রামের মাটির তলায়? উইলসন অনুমান করেছিলেন, সেটি একটি সাপের হাড়। কিন্তু
প্রমাণসাপেক্ষ ছিল তাঁর অনুমান।
তাঁর
ধারণা সঠিক না বেঠিক, তা যাচাই করে দেখার মতো ব্যবস্থা তখন
ভারতে ছিল না। নমুনাটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখার
অনুমতি চান উইলসন। চার বছর ধরে চেষ্টা করার পর অবশেষে অনুমতি আসে। জিওলজিক্যাল
সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (জিএসআই) নমুনাটিকে গবেষণার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে
রাজি হয়।
জীবাশ্মটিকে
পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে সময় লাগে এক বছর। কোটি কোটি বছর ধরে কয়েকটি জৈবিক
অবশেষের সঙ্গে জমে থাকা পাথর খুব সূক্ষ্ম উপায়ে আলাদা করতে হয় গবেষকদের। ২০২৩ সালে, উইলসন ও ভারতের জিএসআই-এর গবেষক ধনঞ্জয়
মহাবে এবং তাঁদের সহকারীরা প্রকাশ করেন তাঁদের গবেষণাপত্র। হ্যাঁ, উইলসনের অনুমান সঠিক প্রমাণিত হয়। একটি
প্রাগৈতিহাসিক সাপের উপস্থিতিও ধরা পড়েছিল জীবাশ্মের ওই নমুনায়।
জীবাশ্মটি
থেকে জানা যায় বহু কোটি বছর আগের একটি মুহূর্তের কথা। একটি ডাইনোসর কয়েকটি ডিম
পেড়েছিল। সেগুলির একটি থেকে বাচ্চা সদ্য ফুটে বেরিয়েছিল। সম্ভবত মা ডাইনোসরটি
সেখানে ছিল না সেই সময়। এবং বাচ্চাটিকে খেতে একটি সাপ চলে এসেছিল ডাইনোসরের
আস্তানায়। বাচ্চাটিকে গিলে খাওয়ার জন্য মুখও খুলে ছিল সাপটি। কিন্তু ঠিক সেই
মুহূর্তে মাটির ধস নামে। আর সেই ধসে চাপা পড়ে যায় তারা। এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই
ডাইনোসরের বাচ্চা, ডিম ও ক্ষুধার্ত সাপটি জীবাশ্মে পরিণত
হয়। আর পাথরের আকারে কয়েক কোটি বছর ধরে থেকে যায় গুজরাটের ধোলিডুংরি গ্রামের মাটির
তলায়।
সাপটির
নাম দেওয়া হয় ‘সানাজেহ ইন্ডিকাস’। সংস্কৃত থেকে এসেছে নামটি, যার মানে হল ‘ইন্দাসের কাছে পাওয়া মুখের হাঁ’। সারা বিশ্বে ওই নামেই আজ পরিচিত
আদিমকালের সেই সাপটি। বিজ্ঞানীদের মতে, সে কালে সাপেরা ছোট ছোট প্রাণী খেত, কারণ বড় প্রাণী গেলার জন্য মুখ যতটা খোলা প্রয়োজন, ততটা খুলতে পারত না তারা। পরে, বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সাপেরা সেই
ক্ষমতা অর্জন করে। ২০১৩ সালে, ওই
এলাকা থেকে ওই একই ধরনের সাপের আরও জীবাশ্ম পাওয়া যায়। সেগুলি নিয়ে নতুন গবেষণা
চালাচ্ছেন গবেষকদের একই দল। তাঁদের মতে, ওই সাপটির আকৃতি ছিল অনেকটা আজকের গিরগিটির মতো।
বিশ্বের
গবেষকদের আক্ষেপ এই যে, জীবাশ্মের দিক থেকে ভারত অত্যন্ত
সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও, সেগুলি সংগ্রহ করার কাজটা আশানুরূপভাবে
এগোয়নি এখানে। ফলে জীবজগতের অনেক রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়নি এখনও।
“এখানেই তিমির আবির্ভাব হয়েছিল। এক সময়
প্রকাণ্ড সব গণ্ডার ও হাতি ছিল এখানে। এখানে পাওয়া গেছে প্রচুর ডাইনোসরের ডিম।
এমনকি ডাইনোসরের আবির্ভাবের আগে, এখানে
বিচরণ করত এক অদ্ভুত শিংওয়ালা সরীসৃপ,” বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অদ্বৈত
জুকার।
তা
সত্ত্বেও বিবর্তনের ইতিহাস রচনায় রয়ে গেছে বড় বড় ফাঁক, তেমনটাই মনে করেন জুকার।
জীবাশ্মের
যে রত্নভাণ্ডার ভারতে রয়েছে, তা
নিয়ে আরও অনেক বেশি অনুসন্ধান প্রয়োজন, বিবিসি-কে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছবি: অনীশ গুপ্ত (লন্ডনের ন্যাচেরাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে ডাইনোসরের কঙ্কালের মডেল)

Comments
Post a Comment