বন্য হাতিদের ক্ষতি করছেন কি পর্যটকরা
দক্ষিণবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায়, হাতির আসা-যাওয়া লেগেই থাকে। গ্রামের মানুষ ভয়ে ভয়ে দিন কাটান ধান কাটার মরসুমে। হাতিরা এলে তারা মজুত করা ধান খেয়ে নেয়। গোলায় ঢোকার চেষ্টা করতে গিয়ে উঠোনের দেওয়াল ভাঙে। বাড়ির পাকা দেওয়ালেও চিড় ধরায়। খেতে ধান থাকলে, তা নিমেশে চলে যায় হাতির দলের খিদে মেটাতে। আর এসবের মধ্যে, হাতির সঙ্গে মানুষের সংঘাতও বাধে। দু’ দিকেই ক্ষয় ক্ষতির খবর আসে মাঝে মধ্যে।
তাই, হাতির দল যাতে জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে না বেরিয়ে আসে, সেই ব্যবস্থা করতেই বনের মধ্যে তাদের খাবার সরবরাহ করার উদ্যোগ নেয় রাজ্যের বন বিভাগ। এর অর্থ হলো, জঙ্গলে যথেষ্ট খাবার পায় না হাতিরা। তাই তারা বন ছেড়ে লোকালয়ে এসে সহজলভ্য খাবারের সন্ধান করে। এবং তারা যাতে সহজেই বনের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী পেয়ে বাইরে না চলে আসে, তা নিশ্চিত করতেই বনের মধ্যে হাতিদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে বন দপ্তর। আপাতদৃষ্টিতে, এই পদক্ষেপ প্রশংসা দাবি করে।
কিন্তু প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ব্যবস্থা আখেরে আসল সমস্যার সমাধান করে না। উপরন্তু বন্য প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণ বদলে দেয়। এবং তাদের মানুষের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, যার পরিণাম ভালো হয় না।
প্রায় ১৮ বছর ধরে গবেষণা করার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, স্যান ডিয়েগোর প্রাণী বিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণা পত্রে বলেছেন, অনেক পর্যটক বন্য প্রাণীদের খাবার দিয়ে মনে কারেন তাঁরা ওই প্রাণীদের উপকার করছেন। কিন্তু আসলে তাঁরা সেই সব প্রাণীদের ক্ষতিই করে থাকেন।
ওই ইউনিভার্সিটি প্রাণী বিজ্ঞানী শারমিন ডি সিলভা, প্রায় দু’ দশক ধরে শ্রীলঙ্কায় বন্য হাতি ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন। পর্যটকদের মধ্যে তিনি হাতিদের খাবার দেওয়ার অভ্যাস লক্ষ্য করেন অনেক দিন ধরে। পর্যটকদের ধারণা যে, তাঁরা ‘বেচারা’ হাতিদের উপকার করছেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায় যে, ওই সুবিধে-পাওয়া হাতিরা বনের মধ্যে খাদ্যের সন্ধান করার তাদের নিজস্ব যে ক্ষমতা আছে, তা তারা হারাতে বসেছে। জঙ্গলে খাবার খোঁজার বদলে তারা মানুষের দেওয়া ফলমূলের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। বনের সব হাতি যে ওই অভ্যাসের শিকার হয়, তা নয়। কিন্তু কিছু হাতিকে বনের ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে হামেসাই দেখা যায়। কেউ কেউ আবার বনের বাইরে বেরিয়ে এসে গাড়ি চলাচলের রাস্তার পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। যদি খাবার পাওয়া যায়, সেই আশায়।
গবেষক ডি সিলভার মতে, ওই সব হাতিরা মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এবং তাদের সাহস বেড়ে যায়। তখন তারা নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে। তার ফলে, অপছন্দের পাত্র হয়ে ওঠে তারা।
তাঁর গবেষণার জায়গা ছিল শ্রীলঙ্কার উডওয়ালাওয়ে ন্যাশনাল পার্ক। তার দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে পর্যটকদের সমাগম হয়, সেখানে হাতিরা এসে হাজির হয়। এবং তাদের আচরণে এক ধরনের ‘ভিক্ষা বৃত্তি’ প্রকাশ পেত। মিষ্টি খাবারের প্রতি তাদের আসক্ত হয়ে উঠতে দেখা যায়। এবং কয়েকবার তারা খাবারের জন্য বেড়া ভেঙে পর্যটকদের আক্রমণও করে বসে। আঠের বছরে, হাতির আক্রমণে বেশ কয়েকজন পর্যটকের মারা যাওয়ার কথা জানতে পারেন তিনি। এবং অন্তত তিনটি হাতিরও প্রাণ যায় এমন ঘটনায়। অনেক পর্যটককে খাবার ভর্তি প্লাস্টিকের ব্যাগ ছুঁড়ে দিতে দেখা যায়। আর হাতিরা প্লাস্টিক ব্যাগ সমেত তাদের আহার মুখে পুরে দেয়। প্লাস্টিক পেটে গেলে যে ভুগতে হবে, হাতিরা তো সে কথা জানে না!
আরও একটি বড়ো বিপদের সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে ওই গবেষণা পত্রে। তা হলো মানুষ থেকে ছড়ান সংক্রমণ। ভারতের তামিলনাডু রাজ্যের নীলগিরি জেলায় সিগুর অঞ্চলের হাতি নিয়ে কাজ করেছেন গবেষণা পত্রের সহলেখক প্রিয়া দাভিদার ও সিগুর নেচার ট্রস্ট-এর জঁ ফিলিপ পিরাভো। এগারো হাতিকে সেখানে পর্যটকরা খাওয়াতে। তাদের মধ্যে চারটি হাতি অসুস্থ হয়ে মারা যায়। একটিকে আবার জঙ্গলে পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়।
মানুষের দেওয়া খাবারে অভ্যস্ত বন্য প্রাণীরা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। সেই কারণে দু’ তরফেই ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, বলেছেন গবেষকরা।

Comments
Post a Comment