আফ্রিকার হাতির চেয়ে এশীয় হাতির মগজ বড়

 


এশিয়া ও আফ্রিকার হাতিদের মধ্যে ফারাক অনেক। আকারে-আকৃতিতে আফ্রিকার হাতি, তাদের এশীয় আত্মীয়দের তুলনায় বড়ো। এশিয়ার হাতি মানুষের খুব কাছের প্রাণী। কিন্তু আফ্রিকার হাতি হলো অরণ্যের রাজা, যাকে বশ মানানো যায়নি এখনও।

হাতি আমাদের সাথি হয়ে আছে সেই প্রাচীন কাল থেকে। ওরা আমাদের মাল বয়ে দিতে সাহায্য করে। সার্কাসে খেলা দেখিয়ে আমাদের মনোরঞ্জন করে। রাজারাজরাদের তারা পিঠে করে বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে এক সময়। অতীতে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, প্রবল বিক্রমে লড়াইও করেছিল তারা যুদ্ধের ময়দানে। আবার ভারতের নানা মন্দিরে তারা আজও আছে। সেখানে পুজোর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। শোভাযাত্রায় বেরোয়। যেখানে মঙ্গলের প্রতীক মনে করা হয় তাদের।

এও দেখা যায় যে, একজন মাহুত তার পোষা হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে ঘুরছে গ্রামে ও শহরে। তার সেই হাতিকে দেখে ছেলেপিলেরা ছুটে এসে ভিড় করে। প্রশ্রয়-মাখানো চোখে হাতি তাদের তাকিয়ে দেখে। টাকা দিতে এগিয়ে আসেন অনেকে। সেই টাকা দিয়ে মাহুত তার বৃহৎ সঙ্গীটির জন্য খাবার জোগাড় করে। এবং সেই সঙ্গে নিজের খোরাকিও। এ এক অদ্ভুত সম্পর্ক। যেখানে হাতি তার মানুষ মনিবের হয়ে অর্থ উপার্জন করতে পথ হাঁটে প্রতিদিন।

কিন্তু সব ক্ষেত্রেই যাদের দেখা যায়, তারা হলো এশীয় হাতি। এর অন্যথা হয় না। আফ্রিকার হাতিদের মানুষের পাশে থেকে এত কিছু করতে দেখা যায় না। এশীয় হাতি হয়ে উঠেছে মানুষের সমাজ ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্থাপত্য ও চিত্রকলায় তারা রয়েছে এক বিরাট জায়গা জুড়ে। তুলনায়, আফ্রিকার হাতি মানুষ থেকে থেকেছে সাত হাত দূরে।

এর কারণ, এশিয়ার হাতিকে পোষ মানানো যায়। পদ্ধতিটা যদিও খুব কষ্টদায়ক ও মর্মান্তিক। কিন্তু আফ্রিকার হাতিকে বশে আনা সম্ভব হয়নি মানুষের পক্ষে। গবেষকদের অনুমান, এই সম্ভব আর অসম্ভবের পেছনে রয়েছে ওই দুই প্রজাতির হাতির মস্তিষ্কের গঠন। তাদের শরীরের আকৃতি যেমন আলাদা, তাদের মস্তিষ্কের আকৃতিতেও লক্ষ্য করা গেছে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা।

সম্প্রতি, জার্মানির বার্লিন ও লাইপজিগ-এরজীববিজ্ঞানীরা এক যৌথ গবেষণায় দেখেছেন যে, এশিয়ার হাতিদের মস্তিষ্কের ওজন আফ্রিকার হাতিদের মস্তিষ্কের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। পিএনএএস নেক্সাসজার্নালে প্রকাশিত তাঁদের গবেষণা পত্রে তাঁরা বলেছেন, সম্ভবত এই জন্যই ওই দুই মহাদেশের হাতিদের আচরণে এত তফাত। গবেষকরা জানিয়েছেন যে, প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে এশীয় হাতির মস্তিষ্কের গড় ওজন ৫,৩০০ গ্রাম বা ৫ কেজি ৩০০ গ্রাম। তুলনায়, আফ্রিকার প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে হাতিদের মস্তিষ্কের গড় ওজন ৪,৪০০ গ্রাম বা ৪ কেজি ৪০০ গ্রাম। অর্থাৎ, এশীয়দের তুলনায়, গড়ে ৯০০ গ্রাম কম। গবেষকরা জানিয়েছেন, পুরুষ হাতিদের ক্ষেত্রে ওই ধরনের হিসেব করা সম্ভব হয়নি। কারণ, পুরুষ এশীয় হাতিদের মস্তিষ্ক সংক্রান্ত তথ্যের অভাব।

গবেষকরা এও দেখেছেন যে, জন্মানর পর, হস্তিসাবকের মস্তিষ্কের ওজন যা থাকে, একটি প্রাপ্ত বয়স্ক হাতির মস্তিষ্কের ওজন প্রায় তার তিন গুণ বেশি। অর্থাৎ, জন্মের পর থেকে হাতির মস্তিষ্কের ওজন তিন গুণ বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধি কয়েক মাস বা দুতিন বছরে হয় না। সময় লাগে অনেক। তাই হস্তিশাবকের শৈশব ও কৈশোরকাল বেশ দীর্ঘস্থায়ী হয়। সেই সময়, মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ঘটেতে থাকে একটু একটু করে। হাতি যে এক অত্যন্ত বুদ্ধিধর প্রাণী, তা সে সহজে হয়ে ওঠে না।

জন্মের পর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠা পর্যন্ত, মানুষের মস্তিষ্কের ওজন বৃদ্ধি পায় পাঁচ গুণ। হাতির ক্ষেত্রে, তা তিন গুণ!

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

প্রকৃতি তৈরি করছে প্লাস্টিকের পাথর

গাছেরা কি দেখতে পায়