এ বছর মৌসুমি বায়ু বয়ে আনে ধ্বংসের পরোয়ানা



আবহাওয়াবিদদের মুখে একটা শব্দবন্ধ প্রায়ই শোনা যায় : পশ্চিমি ঝঞ্ঝা। ওই পশ্চিমি ঝঞ্ঝা দেখা দিলেই, আকাশের মুখ গোমড়া হয়ে ওঠে। ঝলমলে দিনে হঠাৎই মেঘ ঘনায়। বৃষ্টিও নামে। এই বছর ভারতের উত্তর ও পশ্চিমে বার বার অতি ভারি বর্ষণ হয়েছে। তার ফলে, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশে ও জম্মু-কাশ্মীরের নদীতে দেখা দিয়েছে বিধ্বংসী হড়পা বান। খড়কুটোর মতো ঘরবাড়ি ভেসে গেছে জলের মারাত্মক তোড়ে। জলপ্রপাতের মতো নেমে আসা বৃষ্টির ধারায় ফাটল ধরেছে গাছ-কাটা, ভঙ্গুর পাহাড়ের গায়ে। নেমেছে মাটি আর পাথরের ধস। যা আগ্নেয়গিরির ধেয়ে আসা লাভার মতো গ্রাস করেছে জনপদ। পশ্চিম ভারতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে মুম্বাই ও পুনে শহরে। মরু প্রদেশ রাজস্থানের অনেক জায়গা পড়েছে বন্যার কবলে। সেপ্টেম্বর মাসের এক রাত্রে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার টানা বর্ষণে ডুবে ছিল কলকাতার অনেক এলাকা। মারা যান ১১ ব্যক্তি। দক্ষিণবঙ্গে অতিবর্ষণের দাপট কাটতে না কাটতেই, অক্টোবরের শুরুতে উত্তরবঙ্গে চলে বৃষ্টির তাণ্ডব। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, অলিপুরদুয়ার জেলায়, জলের তোড়ে ধস নামে। অস্তিত্বহীন হয়ে যায় অনেক রাস্তা। ভেঙ্গে যায় লোহার ব্রিজ। প্রাণ হারান প্রায় ৩০ মানুষ। ভুটান থেকে খবর আসে, বাঁধের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সে দেশের এক নদী। নেপালে, ৫০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান বিধ্বংসী বর্ষণে। পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলও জলমগ্ন হয়। জুলাই ও আগস্টে, চিনের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। প্রবল বর্ষণে, ফুলেফেঁপে বাঁধ ভাঙ্গে অনেক নদী। জলে ভাসে রাজধানী বিজিং শহরের অনেক এলাকা। খবরে প্রকাশ, প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু হয় সেখানে। এ বছরের মৌসুমি বায়ু যেন বয়ে আনে ধ্বংসের পরোয়ানা।

আষাঢ়-শ্রবণের এই ধ্বংসলীলার পেছনে নাকি ওই পশ্চিমি ঝঞ্জার এক বড়ো অবদান আছে। ডাউন টু আর্থ-এর এক প্রতিবেদন থেকে তেমনটাই জানা গেছে

কিন্তু কী এই পশ্চিমি ঝঞ্ঝা? এটি হল আবহাওয়ার একটি উপাদান। সেটি সৃষ্টি হয় ভূমধ্য সাগরের ওপরে। সেখানে বাতাস সমুদ্র থেকে বাষ্প সঞ্চয় করতে করতে পূর্ব দিকে এগোতে থাকে। যাত্রা পথে, ওই জল-ভরা ভূমধ্যসাগরীয় বাতাস ক্যাস্পিয়ান সাগর ও পারস্য উপসাগর থেকে আরও বাষ্প তুলতে তুলতে ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে অগ্রসর হয়।

সাধারণত, ওই পশ্চিমি ঝঞ্ঝা ভারতে এসে পৌঁছয় শীত ও বসন্তের সময়। তার দৌলতেই হিমালয়ে বরফ পড়ে। সমতলে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত হয়। রবি শস্য জল পায়। দেখা গেছে, কখনও কখনও বর্ষা ঋতুতেও পশ্চিমি ঝঞ্ঝার আনাগোনা চলতে থাকে। তখন, মৌসুমি বায়ুর নিয়ে আসা মেঘ আর পশ্চিমি ঝঞ্জার বাষ্প, এই দুয়ে মিলে সৃষ্টি করে অতি বর্ষণ। দেখা দেয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। 

এ বছর বর্ষায়, স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বার পশ্চিমি ঝঞ্জার আবির্ভাব ঘটেছে ভারতে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে ডাউন টু আর্থ দেখেছে যে, ১ জুন ২০২৫ ও ২০ অগস্ট ২০২৫-এস মধ্যে ১৪ বার পশ্চিমি ঝঞ্ঝা প্রবেশ করেছে ভারতের আকাশে। তার মধ্যে কয়েকটি পাঁচ থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। ফলে, মৌসুমি মেঘ ও ১৪ পশ্চিমি ঝঞ্ঝার জমে থাকা বাষ্প যৌথ ভাবে উত্তর ও পশ্চিম ভারত জুড়ে প্রলয় সৃষ্টি করেছে।

অতি বর্ষণ যে হবে, এ আশঙ্কা নতুন নয়। আজ প্রায় দুদশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই সম্ভাবনার কথা বলে বিশ্বকে সতর্ক করে আসছেন। বিগত কয়েক বছর ধরে সেই ভবিষ্যৎ বাণী যে সঠিক, তা বার বার প্রমাণিত হচ্ছে প্রতি বর্ষায়। কিন্তু তা মোকাবিলা কারার জন্য কোনও পদক্ষেপ এখনও লক্ষ করা যাচ্ছে না। হিমালয় এমনিতেই ভঙ্গুর প্রকৃতির পর্বতমালা। তার মাটি ধরে রাখে গাছগাছালি ও লতাগুল্মের শেকড়ের বিস্তৃত জাল। কিন্তু উন্নয়নের নামে ভারত, নেপাল ও চিনে গাছ কাটা চলছেই। ফলে, আলগা হচ্ছে পাহাড়ের মাটি। রাস্তা তৈরির কাজে ডাইনামাইট ফটানো হচ্ছে নিয়মিত। বিস্ফোরণের কম্পনে চিড় ধরছে পাহাড়ের গায়। খরস্রোতা নদীকে বাঁধ দিয়ে বেঁধে ফেলে চালু থাকছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের কাজ। ফলে, নদী ফুঁসছে। আর এসবের সঙ্গে যোগ হচ্ছে অতি বৃষ্টি। ফলে, প্রতি বছর বিধ্বংসী বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

ছবি : উইকিডিডিয়া কমন্স

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস