শুয়োরের সঙ্গে মানুষের আছে কিছু মিল
হাতি নয়, ঘোড়া নয়। বাঘ, ভালুক, সিংহ নয়। এমনকি আমাদের অতি নিকট আত্মীয়
শিম্পাঞ্জিও নয়। দেখা যাচ্ছে, মানুষের শরীরের কিছু কিছু
অঙ্গের সঙ্গে মিল আছে শুয়োরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের। তাই, সম্প্রতিবিজ্ঞানীরা শুয়োরের ফুসফুসে কিছু জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে সেটিকে প্রতিস্থাপন করেন একব্যক্তির শরীরে। এবং শুয়োরের সেই ফুসফুস মানুষের শরীরে ন’ দিন
কাজ করে। পরীক্ষাটি করা হয় এই বছর অগস্ট মাসে।
শুয়োরের
ওই ফুসফুসটি প্রতিস্থাপন করা হয় এমন একজন ব্যক্তির শরীরে যাঁর মস্তিষ্ককে মৃত বলে
ঘোষণা করেছিলেন চিকিৎসকরা। মেশিনের সাহায্যে মস্তিষ্ক-মৃত মানুষের হৃদযন্ত্র ও ফুসফুস কিছু দিন
চালু রাখা গেলেও, চিকিৎসা শাস্ত্র ও আইনের বিচারে তাঁদের মৃত
বলেই গণ্য করা হয়। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা দেখতে চেয়েছিলেন যে, অন্য প্রাণীর দেহাঙ্গ মানুষের শরীর গ্রহণ করে কিনা। যদি তা সম্ভব হয়,
তাহলে চিকিৎসা শাস্ত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে যাবে, আশা এমনটাই। বাঁচানো যাবে অনেক মানুষকে।
গত অগস্ট
মাসে বিজ্ঞানীরা মানুষের শরীরে শুয়োরের ফুসফুস বসিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন তা চলে কিনা।
দেখা গেল, চলে। এই ক্ষেত্রে তা ন’
দিন চালু থাকে। ফলে, একটা আশার আলো দেখছেন
তাঁরা। এই বিষয়ে আরও গবেষণা চালিয়ে গেলে হয়ত একদিন আমাদের অকেজো হয়ে-যাওয়া
ফুসফুসের জায়গায় জিন প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি শুয়োরের উন্নত ফুসফুস লাগিয়ে আমরা
দিব্যি হেঁসে-খেলে থাকতে পারব।
এই বারই
প্রথম মানুষের দেহে লাগানো হলো শুয়োরের ফুসফুস। এর আগে, ২০২১ সালে, অন্য এক গবেষণায় মানুষের দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল শুয়োরের কিডনি। এবং
তার কয়েক মাস পরেই মানুষের ফেল-করা হৃদযন্ত্রের জায়গায় বসানো
হয় শুয়োরের হৃদযন্ত্র।
অক্টোবর
২০২২-এ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের
নিউ ইয়র্ক শহরে, চিকিৎসকরা এক ব্যক্তির বিকল হয়ে যাওয়া কিডনির
জায়গায় শুয়োরের কিডনি প্রতিস্থাপন করার কথা ঘোষণা করেন। মানুষের শরীরে সেটি ৫৪
ঘণ্টা কাজ করেছিল। এবং তাকেই বিজ্ঞানীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন।
এর
কিছুদিন পরে, ওই একই বছর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, একজন রোগীর বিকল হতে থাকা হার্টের জায়গায় বসানো হয় শুয়োরের হার্ট। সেই হৃদযন্ত্র তাঁর শরীরে ভালো ভাবেই কাজ করতে থাকে। কোন বিশেষ সাহায্য ছাড়াই উনি
ঘুরে বেড়াতে সক্ষম হন। কিন্তু তারপর হঠাৎই তাঁর শারীরিক অবনতি ঘটে। এবং শুয়োরের হার্ট নিয়ে দু’ মাস বেঁচে থাকার পর,
তাঁর মৃত্যু হয়। এর পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে
একই ধরনের আরও একটি পরীক্ষা হয় ২০২৩ সালে। সেবার শুয়োরের হার্ট নিয়ে রোগী বাঁচেন
৪০ দিন।
তবে
এসবের অনেক আগে, সেই ১৯৯৭ সালে, ভারতের অসমে, শল্যচিকিৎসক
ড. ধনিরাম বড়ুয়া একজন হার্টফেল করা রোগীর শরীরে শুয়োরের
হার্ট বসিয়ে ছিলেন। এবং সেই হার্ট মানুষের শরীরে সাত দিন কাজ করে ছিল। বাস্তবিকে,
সেটাই ছিল প্রথম পরীক্ষা যেখানে শুয়োরের অঙ্গ মানুষের শরীরে
প্রতিস্থাপন করা হয়। এবং তা কাজ করে কয়েক দিন। কিন্তু গবেষণার নিয়মকানুন বা
প্রোটোকল না মেনে কাজটি করার জন্য ড. বড়ুয়া কোনও স্বীকৃতি
পাননি। উপরন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ!
বিজ্ঞানীরা
বলছেন এই সব পরীক্ষার উদ্দেশ্য হলো, প্রতিস্থাপন যোগ্য অঙ্গের সরবরাহ বাড়ানো। এখন যা সহজে
মেলে না। ফলে, মারা যান অনেক রোগী। তাই অন্য প্রাণীর অঙ্গ
মানুষের শরীরের উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। যাতে প্রতিস্থাপন করার মতো অঙ্গ
পেতে অসুবিধে না হয়।
কিন্তু
শুয়োরের ফুসফুস, শুয়োরের কিডনি, শুয়োরের হার্ট — তাই বা কেন? বাঘ, সিংহ,
শিমপাঞ্জিরও তো হতে পারত? বিজ্ঞানীরা বলছেন,
শুয়োরের ওপর নজর পড়ার প্রথম কারণ হলো, ওই
প্রাণীটির হার্ট, কিডনি, ফুসফুসের
আকার-আকৃতি মানুষের অঙ্গগুলির সঙ্গে মেলে। দ্বিতীয়ত, শুয়োরের
সংখ্যা অনেক; তারা কোনও বিপন্ন প্রাণী নয়। তাই, জিন প্রযুক্তির দ্বারা উন্নত-করা অঙ্গ, যা মানুষের
শরীর প্রত্যাখ্যান করবে না, তা শুয়োরের পালের কাছ থেকে সহজে
পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই
বাঁচার তাগিদে আমাদের শুয়োরের স্মরাপন্ন হতে হচ্ছে। হয়ত একদিন অনেক মানুষ শুয়োরের হার্ট, ফুসফুস, কিডনির মতো আরও কিছু দেহাংশ অবলম্বন করে অনায়াসে স্বাভাবিক জীবন কাটাতে
পারবেন।
ছবি: উইকিপিডিয়া
কমন্স

Comments
Post a Comment