সমুদ্রের তলায় এত আলো কেন
সমুদ্রের
নীচে আলো জ্বলে। ১৮৬৪ সালে, ‘অ্যালাবামা’ নামের একটি জাহাজ সমুদ্রের জল কেটে
এগিয়ে চলেছিল। সূর্যাস্ত হয়ে যায়। সমুদ্রের বুকে নামে জমাট অন্ধকার। কম্পাসের ওপর
নজর রেখে, সঠিক দিকেই জাহাজ চালনা করছিলেন ক্যাপ্টেন রাফায়ের
সেম্মেস। কিন্তু হঠাৎই, সমুদ্রের চেহারা বদলে যায়। ঘোর
অন্ধকারের বদলে, একটা আলোর আভা ফুটে বেরতে লাগল সমুদ্রের
গভীর থেকে। আশ্চর্য হয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেন লিখে ছিলেন, “প্রকৃতির
পুরো চেহারাটা অকস্মাৎ পাল্টে গেছে...মনে হচ্ছে এক ভুতুড়ে সমুদ্রের ওপর দিয়ে
আমাদের জাহাজ চলেছে”। নাবিকরা এমনিতেই বিশ্বাস করতেন যে,
সমুদ্রে নানা দানবের বাস। সেখানে থাকে জলপরীরাও। তাই, জলের তলায় আলো দেখে আতঙ্কিত হয়ে ছিলেন জাহাজের শক্তিমান সব নাবিকরা। কয়েক
ঘন্টা ধরে সেই আলোকিত সাগরের মধ্যে দিয়ে চলেছিল জাহাজ। যেন সমুদ্রের গভীরে কোনও
তলিয়ে যাওয়া শহরের ঝলমলে আলো উঠে আসছিল ওপরে।
হ্যাঁ, আলো ছিল ঠিকই। তবে সে আলো
কোনও হারিয়ে যাওয়া শহরের রোশনাই ছিল না। সেই আলো সৃষ্টি করে ছিল সমুদ্রতলে জীবাণুর ঝাঁক। তাদের বলা হয় ‘বায়োলুমিনেসেন্ট’ ব্যাক্টিরিয়া। অর্থাৎ, জৈবিক উপায়ে আলো সৃষ্টিকারী
জীবাণু। তাদের সংখ্যা কত হবে বলা মুশকিল। লক্ষ কোটিও ছাড়িয়ে যাবে হয়ত। সমুদ্রপৃষ্ঠ
থেকে সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে তারা। আলোর উৎস জানা গেলেও, কী ভাবে সেই আলো উৎপন্ন হয়, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এই বিষয়েগবেষণা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভারসিটির গবেষক স্টিভেনমিলার। আকাশে ভাসমান উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবি উনি বিশ্লেষণ করে চলেছেন। সমুদ্রের জলে
আলোর আভা যখন ফুটে ওঠে, তখন তা মহাকাশ থেকেও দেখা যায়। অন্তত, উপগ্রহের চোখে
তা ধরা পড়ে। সেখান থেকে পাঠানো ছবি তা প্রমাণ করে।
আবারও এক
জাহাজের ক্যাপ্টেনের কথায় আসতে হয়। সালটা ছিল ১৯৯৫। ‘লিমা’ নামক একটি জাহাজ আফ্রিকায় সোমালিয়ার উপকূল ঘেঁসে চলেচিল। সেই জাহাজের
ক্যাপ্টেন জানান, তিনি হঠাৎই সমুদ্রের দিগন্ত জুড়ে সাদা আলো
লক্ষ্য করেন। এবং মিনিট পনেরর মধ্যে সেই আলো ছড়িয়ে পড়ে সারা সমুদ্রের জলে। তাঁর
মনে হয়, তাঁর জাহাজ সাদা বরফের ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে।
লিমা
জাহাজের ক্যাপ্টেনের এই অভিজ্ঞতার কথা জানার পর, গবেষক মিলার সেই সময়কার উপগ্রহ
চিত্রগুলি দেখতে থাকেন। এবং যে দিনটিতে লিমা জাহাজ থেকে ওই আলো দেখা গিয়ে ছিল,
সেই দিনের উপগ্রহ থেকে পাঠানো ছবিতেও ধরা পড়ে ছিল সমুদ্রের
জীবাণুদের সৃষ্ট সেই আলোর দৃশ্য। সমুদ্রের এক বিরাট অঞ্চল — প্রায়
১৫ হাজার বর্গ কিলোমিটার — জুড়ে ছড়িয়ে ছিল সেই আলো।
গবেষক
মিলার বলেছেন, সমুদ্রের জলে যে আলো সৃষ্টি হয়, সে ব্যাপারে নিশ্চিত
হওয়া গেছে। কিন্তু কেন ও কী ভাবে তা তৈরি হয়, সেই রহস্যের
সমাধান এখনও করা যায়নি।
মার্কিন
মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা’র মতে, মানুষ মহাকাশ সম্পর্কে
অনেক কিছুই জেনেছে। কিন্তু সেই তুলনায়, পৃথিবীর সমুদ্র এখনও
অনেকটাই অজানা থেকে গেছে মানুষের কাছে।
ছবি: উইকিপিডিয়াকমন্স
.jpg)
Comments
Post a Comment