উষ্ণায়নে গরিবের সঙ্কট বেশি - দুফলো

 


আবহাওয়া পরিবর্তন এখন আর কোনও ভবিষ্যৎ আশঙ্কার বিষয় নয়। সেই পরিবর্তন এখন আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলেছে। তার প্রভাব আমরা অনুভব করছি। এই বছরের কলকাতা বইমেলায়, এ বিষয়ে কথা বলেন নোবেল পুরস্কার-প্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ এস্থার দুফলো। তাঁর সাক্ষাৎকারটি নেন রুদ্র চ্যাটার্জি, চা শিল্প সহ অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গেও যিনি যুক্ত।

আমরা যদি যেমন চলছি তেমনই চলি, পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে যদি কোনও পদক্ষেপ না নিই, তাহলে আগামী দশ বছর পরে কলকাতার অবস্থা কেমন হবে? এমনই প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয় সাক্ষাৎকার।

দুফলো বলেন, ওই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক কিছু যা তাঁর বিষয় নয়। তবুও, যদি দশ কুড়ি বছরের একটা সময় কাল ধরা হয়, তাহলে, আমরা যাই করি না কেন, সেই সময়ের মধ্যে আবহাওয়া পরিবর্তন ঠেকানো সম্ভব হবে না। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক আলোচনা সভায়। গড় তাপমাত্রা যদি তার বেশি বাড়ে, তাহলে এই গ্রহ এক গভীর সঙ্কটের সম্মুখীন হবে। সে বিষয়ে এক মত হয়ে ছিলেন সকলে। কিন্তু, দুফলো বলেন, আমরা তো ইতি মধ্যেই ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে গেছি। অর্থাৎ, বিপদসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছি আমরা।

দুফলো বলেন, সারা বিশ্বে গরম বাড়ছে। গত বছর জুলাই মাসের এক দিন, পৃথিবীর ৪০ শতাংশ স্থানে তাপমাত্রা এমন জায়গায় পৌঁছয় যা মানুষের সহ্য করার ক্ষমতার বাইরে। তার মানে, তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা, দুয়ে মিলে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা বেশি দিন স্থায়ী হলে, অসহনীয় হয়ে ওঠে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, তেমন অসহনীয় দিনগুলির সংখ্যা বছর বছর বাড়বে। ফলে অসুবিধের মধ্যে পড়বেন সকলেই। কিন্তু, দুফলো বলেন, বিশেষ ভাবে সঙ্কটাপন্ন হবেন গরিব মানুষ। মানুষের শরীরের ওপরও তার প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে অল্পবয়সীদের কিডনির সমস্যা দিখা দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। তাছাড়া, আমাদের জীবনযাত্রার মান খারাপ হবে। উষ্ণায়নের ফলে আমরা এখন, এই মুহূর্তে, কী ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি তার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। যাতে এখনই তার প্রভাব কমানোর জন্য আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি।

রুদ্র চ্যাটার্জি বললেন, দশ বছর আগেও উত্তরবঙ্গে তাপমাত্রা কদাচিৎ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠত। কিন্তু তেমন দিনের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে কয়েক বছর ধরে। এবং গত বছর ৪০+ ডিগ্রি দিনের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩৩। রুদ্র বলেন, উত্তরবঙ্গের নীচু অঞ্চলে এমনটা ঘটছে এখন। কিন্তু দার্জিলিংয়ের উঁচু পাহাড়েও যদি তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, তাহলে সেখানকার চা বাগানে যে বিশ্ব বিখ্যাত দার্জিলিং চা উৎপন্ন হয়, তার স্বাদও পাল্টে যাবে।

উনি আরও জানান যে, উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর কার্পেটের জন্য বিখ্যাত। কার্পেট সরবরাহ করার ক্ষেত্রে, ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ সময় মেনে কাজ হয়। কিন্তু গত বছর প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে সময় মতো কার্পেট সরবরাহ করতে পারেননি প্রস্তুতকারকরা।  কারণ, কয়েক দিন এমনই প্রবল গরম পড়েছিল যে কাজে আসতে পারেননি কর্মীরা। তাই সময় মতো কার্পেট তৈরি করা যায়নি।

তাছাড়া, আরও একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন তিনি। অস্বাভাবিক অনাবৃষ্টির ফলে, অস্ট্রেলিয়ায় নাকি ভেড়ার পশম উৎপাদন বেশ অনেকটাই কমে যায়। অথচ, ভেড়ার পশম বিক্রি করে উপার্জন করেন মেশ পালকরা।

বিশ্ব জুড়েই উষ্ণায়ন ঘটছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ছে। কিন্তু দুফলো বলেন, সব দেশেই একই রকম ভাবে গরম বাড়ছে তা নয়। শীত প্রধান দেশে গরম বাড়লেও তা অসহনীয় হয়ে উঠছে না। কিন্তু গ্রীষ্ম প্রধান দেশে তাপমাত্রা আরও বাড়লে, তা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠছে। আর গরিব মানুষ, যাঁদের এসি ব্যবহার করার ক্ষমতা নেই বা গরম পরিবেশে কাজ করতে হয়, তাঁদের অবস্থাটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সবচেয়ে শোচনীয়। এবং দুফলো বলেন, পৃথিবীর গ্রীষ্ম প্রধান অঞ্চলেই গরিব মানুষের সংখ্যা সব চেয়ে বেশি। উষ্ণায়নের ফলে সব চেয়ে বেশি কষ্ট সইতে হবে তাঁদেরই।

ছবি: অনীশ গুপ্ত

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস