কোনও রাজা রাণী ছিল না মহেঞ্জোদারোয়

 

মহেঞ্জোদারো

আমরা যদি এক সবাই রাজার দেশেবা এক নৃপতিহীন রাজ্য যেতে চাই,  তা হলে বাক্স-প্যাটরা, জলের বোতল নিয়ে চড়ে বসতে হবে একটা টাইম মেশিনে। সেটা আমাদের নিয়ে যাবে বহু দূরে। আজ থেকে প্রায় হাজার পাঁচেক বছর পেছনে। সেই কয়েক হাজার বছর আগের এক কাক-ডাকা ভোরে, আমরা পৌঁছে যাব আমাদের গন্তব্যে: মহেঞ্জোদারো।

সে এক জমজমাট শহর। রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাট, খাদ্যশস্যের ভাণ্ডা,  সুভদ্র নাগরিক বৃন্দ  সব মিলিয়ে যাকে বলে এক সমৃদ্ধ সভ্যতা। সেই নগরের অদূরেই বয়ে গেছে এক নদ। সিন্ধু নামে সেই প্রবাহ আজও খ্যাত। ভ্রমণপিপাসু পর্যটক আমরা। তাই সময় নষ্ট না করে আমরা সকাল সকাল নগর দর্শনে বেরিয়ে পড়ব।

২০২৪ সালের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত আমরা। তাই খৃস্টপূর্ব ২৬০০ সালের এক শহরে গিয়ে আমরা যে দিশেহারা বোধ করব,  তা কিন্তু নয়। দেখব,  আজকের অনেক শহরতলির চেয়ে সেই শহর অনেক বেশি উন্নত। ঠিকই যে,  সেখানে গাড়িঘোড়া, বাস, ট্রাম, ট্রেন, অটো, টোটো, রিক্সা ইত্যাদি নেই। তাই চলা ফেরা করতে গেলে পায়ের জোর লাগবে কিছু বেশি। আরও একটা সমস্যা অবশ্য আমাদের বেশ বেগ দেবে। তা হল ভাষা। কয়েক হাজার বছর পরে, আজও উদ্ধার করা যায়নি সেখানকার লোকজন কী ভাষায় কথা বলতেন। বোঝা যায় নি তাঁদের ভাষার মানে।

তবে প্রথমেই আমাদের নজর কাড়বে শহরের গঠন। সুন্দর বাঁধানো সোজা সোজা রাস্তা। গ্রিড মেনে তৈরি। কোথাও শরু, কোথাও চওড়া। দুপাশে চমৎকার ইঁটের তৈরি পাকা বাড়ি। বর্জ্য জল শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সুবিন্যস্ত পয়ঃপ্রণালী। বুঝতে অসুবিধে হবে না যে, অনেক পরিকল্পনা করে তৈরি করা হয়েছে শহরটি। একটা আধুনিকতার ছাপ সেখানে সুস্পষ্ট, আজকের অনেক শহরে যার অভাব যথেষ্ট প্রকট। মানতেই হবে, সে কালের নগর পরিকল্পনাকারীরা ছিলেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, চিন্তাশীল ও দক্ষ।

যে বাড়িতে আমরা থাকব (হোমস্টে?), সেটি রাস্তার ওপর ছিমছাম একটি পাকা বাড়ি। শোওয়ার ঘর, রান্নার জায়গা, স্নানঘর, শৌচালয় সবই আছে। ঘুরতে ঘুরতে আমরা দেখব যে, শহরের সব বাড়িতেই এই সুবিধেগুলি রয়েছে। এমনকী সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য শহরের নানা জায়গায় রয়েছে পাবলিক শৌচাগার, এখনকার সুলভ শৌঁচাগারেরমতন। নগর জীবনের স্বাচ্ছন্দ উপভোগ করার জন্য যে যে ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, তা সবই আছে। ফলে, আমাদের থাকাটা বেশ আরামদায়কই হবে।

পরিক্রমার মধ্যে দিয়ে আমরা বুঝতে পারব যে, শহরটার দুটো সুস্পষ্ট ভাগ রয়েছে। নীচের ও ওপরের এলাকা। নীচের শহরে নগরবাসীর বাস। সেখান নাগরিকদের বাড়িঘর। বাজার। ধাতুর জিনিস, বস্ত্র, মাটির জিনিস, কাঠের সরঞ্জাম তৈরির কারখানা। আর ওপরের শহরে রয়েছে মহেঞ্জোদারোর সেই বিখ্যাত স্নানের জায়গা এক বিরাট ইঁট-বাঁধানো জলাধার। আর সেই জলাধার দেখাশোনা করার কর্মীদের বাসস্থান। ওই জলাধারই সেখানকার মধ্যমণি। নগর জীবনের আর কোনও উপকরণ সেখানে নেই। এমনকী সেখানে পৌঁছনর রাস্তা এতই শরু যে গরুর গাড়িতে করে সেখানে যাওয়া যায় না। পায়ে হেঁটেই যেতে হয় সেখানে। শহররের হট্টোগোলের বাইরে রাখা হয়েছে ¯স্নানের ওই জলাধারকে। বোঝা যায় ¯স্নানের গুরুত্ব খুব সেখানে।

মূল শহরে নাগরিকদের নিজ নিজ গৃহ ছাড়াও চোখে পড়বে পেল্লায় কিছু বাড়ি। প্রাণচঞ্চল নগরের মধ্যেই অবস্থিত। সেগুলি কি কোনও রাজার প্রাসাদ? রাজপরিবারের সদস্যদের বাসগৃহ? কোনও অভিজাত শ্রেণীর বাড়ি? কোনও ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করে যে জেনে নেওয়া যাবে, তার কোন উপায় নেই। বাধা সেই ভাষা।

ফলে সঙ্গে করে নিয়ে আসা, ব্যাকপাকের একটা খাপে রাখা বইটা বার করতেই হয়। নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড গ্র্যায়েবার ও প্রত্নত্ত্ববিদ ডেভিড ওয়েনগ্রোর লেখা দ্য ডন অফ এভরিথিংবইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে দেখে নিলে, পরিষ্কার হয় যায় অনেক কিছু।

তাঁরা বলেছেন, মহেঞ্জোদারোয় রাজরাজরাদের অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওই সভ্যতা, সেখানকার মানুষজন যে কোনও রাজার দ্বারা চালিত হতেন বা তাঁর অধীনে ছিলেন, সেই রকম কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক বা নৃতাত্ত্বিক সাক্ষপ্রমাণ নেই। এমনকী বিক্রমশালী যোদ্ধা শ্রেণীও অনুপস্থিত সেখানে। জনগণের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ কি হত না? না হওয়াটা অস্বাভাবিক, বলেছেন দুই বিশেষজ্ঞ। কিন্তু হাতে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে, কুচকাওয়াজ করতে করতে, যুদ্ধে যেতেন না সিন্ধু সভ্যতার মানুষজন। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ চালিয়ে সেখানকার মাটিতে চাপা পড়ে থাকা অনেক কিছু পাওয়া গেলেও, কোনও অস্ত্র পাওয়া যায় নি। যুদ্ধে রুচি ছিল না তাঁদের। হয়ত, ‘যুদ্ধ করে করবি কী তা বলগানটা মুখে মুখে ফিরত সেখানে, সেই যুগে।

তা হলে ওই অট্টালিকাগুলি কী কাজে আসত? অনুমান, সেগুলি ছিল পৌর ভবন বা টাউন হল। যেখানে সম্ভবত জনপ্রতিনিধিদের সমাগম হত। অলোচনায় বসতেন তাঁরা। নগরের উন্নতি বা সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা করা হত।

মহেঞ্জোদারোর অলিতে-গলিতে, প্রসশস্ত জনপথে, ঘুরতে ঘুরতে আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত সেখানকার ধর্মস্থানের সন্ধান করবেন। একবিংশ শতাব্দীর মানুষ আমরা। ধর্মের সঙ্গে আমাদের ওঠা বসা। মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বার রয়েছে আমাদের শহরে ও গ্রামে। কিন্তু খৃষ্টপূর্ব ২৬০০ সালের ওই নগরে ধর্মস্থানের খোঁজ করতে গিয়ে হতাশ হতে হবে। সেখানে কোনও ধর্মস্থান নেই। কোনও মন্দির বা উপসনা গৃহের সন্ধান পান নি প্রত্নতাত্ত্বিকরা। পাওয়া যায় নি কোনও পুরহিতের মূর্তিও।

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে, সিন্ধু সভ্যতার চালিকা শক্তি ছিল জন সাধারণের মতামত, কোনও রাজাধিরাজের আদেশ নির্দ্দেশ নয়। নাগরিকই ছিলেন সেই নগর সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র।

সূত্র: দ্য ডন অফ এভরিথিং এ নিউ হিস্ট্রি অফ হিউম্যানিটি

ছবি: উউকিপিডিয়া কমন্স

 

  

 

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস