মস্তিষ্কের সিন্দুকে রাখা থাকে স্মৃতি
পুরানো সেই দিনের কথা,
সেই চোখের
দেখা প্রাণের কথা কি কখনও ভোলা যায়? যায় না। তাই অনেক কাল কেটে গেলেও,
বার বার
মনের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে সেই ভোরের বেলা ফুল তোলার স্মৃতি।
আসলে মনে রাখার মতো কোনও ঘটনা যাতে আমরা ভুলে না যাই,
তার জন্য
আমাদের মস্তিষ্কে বিশেষ ব্যবস্থা আছে। সে স্মৃতি সুখেরই হোক বা দুঃখের।
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রকেফেলার ইউনিভারসিটির গবেষক রাজা সেতুপতি,
মস্তিষ্কে
স্মৃতি কী ভাবে সঞ্চিত হয়, তা অনুসন্ধান করে দেখেছেন। ‘নেচার’
জার্নালে
প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গবেষণা পত্র।
দেখা গেছে, আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশে স্মৃতি সঞ্চিত
হয় সেটির নাম, হিপোক্যাম্পাস। স্মৃতির মহাফেজখানার এমন
অদ্ভুত নাম হলো কেন, তা বলা মুশকিল। গ্রিক ভাষায় ‘হিপো’ মানে ঘোঁড়া। আর ‘ক্যামপাস’
হলো
সমুদ্রের দানব। দু’টি শব্দ ল্যাটিন ভাষায় এক হয়ে গিয়ে,
তৈরি হয় ‘হিপোক্যাম্পাস’। তার সঙ্গে আমাদের স্মৃতি ভাণ্ডারের কী
সম্পর্ক, তা চিকিৎসাশাস্ত্রের রচয়িতারাই বলতে পারবেন।
একটা সম্পূর্ণ ঘটনা আমাদের ব্রেনের হিপোক্যাম্পাসে গচ্ছিত থাকে। সেই ঘটনার
স্মৃতিকণাগুলি আবার আলাদা আলাদা করে রাখা থাকে মস্তিষ্কের অন্যান্য কোটরেও। ধরা যাক, ছেলেবেলায়,
কোনও এক
আলোয় ভরা আশ্বিনে, আপনার দেশের বাড়িতে গিয়ে আপনার দিদিমার
হতে তৈরি মোরব্বা খেয়ে মুগ্ধ হয়ে ছিলেন আপনি। সেই ঘটনা বা অভিজ্ঞতাটির সম্পূর্ণ
রূপটা ধরা থাকবে আপনার মাথার হিপোক্যাম্পাসে। আবার ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত আলাদা
আলাদা, স্বতন্ত্র উপকরণগুলি রাখা থাকবে আপনার কপালের পেছনে,
মস্তিষ্কের
‘প্রিফ্রন্টাল কোর্টেক্স’—এ। আপনার দিদিমার মুখ,
তাঁর
পরণের সাড়ি, সে দিনের সেই বাড়িটা, দিনের সোনালী রঙ,
মোরোব্বা,
আপনার
আঙ্গুলের ডগায় লেগে থাকা তার চিটচিটে রস...টুকর টুকর সবই রাখা থাকবে বিভিন্ন খোপে।
এই ব্যবস্থার কারণটাও বলেছেন গবেষক। স্মৃতি রক্ষার এ হলো এক উপায়। যে কোনও
একটা উপাদানের কথা মনে হলেই, হিপোক্যাম্পাসে রাখার পুরো ঘটনাটার
স্মৃতিটা আবার ভেসে উঠবে মনের ছোখের সামনে। ঠিক যেন,
সুরক্ষার স্বার্থে,
স্মৃতির
সিন্দুকের অনেকগুলো চাবি রাখা থাকে এখানে ওখানে।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে একটি সিনেমার কথা। অজয় কর পরিচালিত,
উত্তম
কুমার ও সুচিত্রা সেন অভিনীত, জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘হারানো সুর’। একটি পথ দুর্ঘটনায় ছবির নায়কের
স্মৃতিভ্রংশ হয়। দুর্ঘটনার আগের জীবনের কিছুই মনে করতে পারতেন না তিনি। অর্থাৎ, স্মিৃতির লকার হিপোক্যাম্পাসকে খোলা
যাচ্ছিল না কিছুতেই। কিন্তু একটা বিশেষ গান শুনলেই,
তার মধ্যে
এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যেত। তারপর অবশেষে,
ওই গানের
সুরটা নিজের মনের মধ্যে ভাঁজতে ভাঁজতে, হঠাৎ একদিন মনে পড়ে গেল অতীতের সব কথা।
প্রিফ্রন্টাল কোর্টেক্স—এ রাখা একটা চাবি দিয়েই হয়তো খুলে
গিয়ে ছিল স্মৃতি সিন্দুকের সেই বন্ধ দরজা।
ছবি: উইকিপিডিয়া কমন্স

Comments
Post a Comment