প্রাণীদের কি মন আছে?
আমাদের চারপাশে যারা থাকে - কুকুর,
বেড়াল,
গরু,
ছাগল, ঘোড়া - তাদের কি আনন্দ
বা মন খারাপ হয়?
তারা কি কখনও মানসিক যন্ত্রনায় ভোগে? অথবা
আবসাদের শিকার হয় কি তারা?
এক সময় মনে করা হত, এই সব প্রাণী বা
পশুদের মন বলে কোনও বস্তু নেই। এখনও অনেকে তেমনটাই মনে করেন। তাই তাদের সঙ্গে
খারাপ ব্যবহার করেন তাঁরা। এমনকি অত্যাচারও করে থাকেন।
প্রাচীন ভারতে মনে করা হত মানুষ সহ সব
প্রাণীরই আত্মা আছে। আমরা সকলে, একে অপরের সঙ্গে, সেই সূত্রে
বাঁধা। তাই প্রাণীদের প্রতি অহিংস আচরণের কথা বলা হয়েছিল বার বার। এখন বিজ্ঞান বলছে, পৃথিবীজুড়ে
ছড়ানো আছে প্রাণের এক বিশাল জাল, যাতে জীবাণু, কীটপতঙ্গ, হাতি—ঘোড়া, জলের পুঁটি
থেকে তিমি, মানুষ -
সবাই জড়িয়ে আছি সেই প্রাণের জালে। এখন এও বলা হচ্ছে, প্রাণীদের
মনও আছে।
ফ্রান্সের রেন ইউনিভারসিটির প্রাণী
বিজ্ঞানী মার্টিন হসবার্গার বলেছেন, প্রাণীদের আচরণ দেখে আমরা তার মানে বুঝতে পারি না অনেক সময়।
যেমন, মাঝে মাঝে পোশা
ঘোড়াদের ভীষণ লম্ফঝম্প করে খেলতে দেখা যায়। মনে হবে, তারা বোধহয় আনন্দ
করছে নিজেদের মধ্যে। হসবার্গ ৩০ বছর ধরে ঘোড়া নিয়ে গবেষণা করছেন। উনি বলেছেন যে, স্বাধীন বন্য ঘোড়ারা কিন্তু ওই
ধরনের লাগাম—ছাড়া
খেলায় মাতে না। তাঁর মতে, ওই খেলার মানে হল, পোষা বা সেই অর্থে বন্দি ঘোড়ারা তাদের মানসিক চাপ ঝেড়ে ফেলার
চেষ্টা করে ওই কসরতের মাধ্যমে।
হসবার্গার ও তাঁর সহযোগীরা বিশেষ যন্ত্র দিয়ে ঘোড়ার
মস্তিষ্কের তরঙ্গ মাপেন। দেখা যায়, যে ঘোড়াগুলি এক সঙ্গে থাকে, দল বেঁধে চরতে বেরয়, তাদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ খুব শান্ত ভাবে ওঠা নামা করে। তা থেকে
বোঝা যায় যে, তারা মানসিক
ভাবে স্থীর আছে। আর যেগুলি বদ্ধ জায়গায় একা একা থাকে, অন্যদের সঙ্গে মেশার
সুযোগ পায় না তেমন, তাদের মাথার তরঙ্গগুলি ওঠা নামা করে খুব দ্রুত। যা কিনা মানসিক
অস্থিরতার ইঙ্গিত বলেই চিহ্নিত করছেন হসবার্গার। শান্ত বা অশান্ত মনের মানুষের
মস্তিষ্কের তরঙ্গের ক্ষেত্রেও একই ছবি ফুটে ওঠে।
‘সায়েন্স নিউজ’-এ প্রকাশিত একটি লেখায় বলা হয়েছে যে, বিজ্ঞানীরা এখন
প্রাণীদের মনের কথা আরও বেশি করে জানতে পারছেন। যেমন, তাঁরা দেখেছেন যে, একটি ইঁদুরকে যদি
তার ল্যাজ ধরে খানিকক্ষণ ঝুলিয়ে রাখা হয়, তাহলে বাকি দিনটা সে মন মরা হয়ে থাকে। মৌমাছিদের যদি একটু চিনি
দেওয়া হয়, তাহলে তারা
খুশি বোধ করে। ঠিক যেমন পাতে রসগোল্লা বা সন্দেশ পড়লে আমরা পুলকিত হই। পরীক্ষা
করে দেখা গেছে, চিংড়িদের
মনেও উদ্বেগ দানা বাঁধে। মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কমাতে যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়, সেই ওষুধ দেওয়াতে, তাদের মধ্যেও উদ্বেগ
দূর হয়ে যায়। মানুষের মতো ‘ফেরেট’ বা নকুল—জাতীয় প্রাণীটিরও একঘেয়ে লাগে মাঝে মাঝে। দিনগত পাপোক্ষয়, মনে হয় কি তাদেরও? এবং অক্টোপাস ও
মাছেরা ব্যথা অনুভব করে। তা হলে, আমাদের মাছে বাজারে যা হয়, তা তো অতি নিষ্ঠুর ও যন্ত্রণাদায়ক বলেই ধরে নিতে হয়। অনেকে
জ্যান্ত মাছ কেনায় বিশেষ এক তৃপ্তি অনুভব করেন। কিন্তু মাছ বিক্রেতা যখন জ্যান্ত
অবস্থাতেই একটি মাছের আঁশ ছাড়াতে শুরু করে দেন, তখন সেই রুই, কাতলা, চারাপোনা যে কী অসহনীয় যন্ত্রণার শিকার হয়, সেটা কেউই ভেবে
দেখেন না।
গত বছর, ইংলন্ডের লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স অ্যান্ড পোলিটিক্যাল সায়েন্সএকটি লেখা প্রকাশ করে। তাতে সব ধরনের কাঁকড়া, চিংড়ি ও অক্টোপাসকে অনুভূতিশীল প্রাণী বলে ঘোষণা করা হয়।
ইংলন্ডে এখনও চিংড়ি গরম জলে ডুবিয়ে মারা হয়। ওই লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার ফলে, ওই প্রথা বন্ধ করার
জন্য নতুন আইন আসছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রাণীরা যে কেবল শারীরিক যন্ত্রণা অনুভব
করে তা নয়। মানসিক ব্যথাও তাদের অনুভূতি মধ্যে পড়ে। এখন আর্টিফিসিয়াল
ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ শুরু হয়েছে। একটা বুদ্ধিমান মেশিন এখন
অনেক জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারে। সামনে নিয়ে আসতে পারে অনেক না—দেখা, না—জানা বিষয়। সেই
রকমই মেশিনের সাহায্যে, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ইঁদুরের মধ্যে সুখ, বিতৃষ্ণা, ভয়ের মতো অনুভূতি কাজ করে।
অক্টোপাসরাও যন্ত্রণা অনুভব করে। এবং একটা খারাপ অভিজ্ঞতার স্মৃতি থেকে যায় তাদের মস্তিষ্কে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ফ্র্যানসিসকো ইউনিভারসিটির একটি পরীক্ষাগারে অক্টোপাসদের জন্য ছিল বেশ কয়েকটি কক্ষ। একটি অক্টোপাস বেছে নিয়ে ছিল তার পছন্দের কক্ষটি। সেখানেই সে থাকত। এক দিন, যখন সে তার কক্ষে বসে আরাম করছিল, তখন তাকে একটি যন্ত্রণাদায়ক ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। ঘন্টাখানেক পরে, তার ব্যথা কমে যায়। কিন্তু সে তার নিজের বেছে নেওয়া কক্ষটিতে আর ফিরে যায় না। সে চলে যায় অন্য একটি কক্ষে। যেখানে সে কোনও দিন যায়নি। হয়ত, তার ভাল লাগার জায়গাটির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে ছিল যন্ত্রণার স্মৃতি।
ছবি: উইকিপিডিয়া কমন্স
.jpg)
Comments
Post a Comment