গঙ্গা রহস্য
হিন্দুদের কাছে তো সেই আদি কাল
থেকেই গঙ্গা পবিত্র নদী বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। এমনকি গঙ্গাকে দেবীর মর্যাদাও দেওয়া
হয়েছে শাস্ত্রে। তার জল এতটাই বিশুদ্ধ বলে মনে করা হত যে, কোনও
ধর্মীয় কাজ গঙ্গা জল ছাড়া ছিল অসম্ভব। সেই রীতি আজও বজায় আছে।
কিন্তু কেবল যে হিন্দুদের কাছেই
গঙ্গার বিশেষ গুরুত্ব ছিল তা নয়। যা অনেকের অজানা তা হল, মোগল
সম্রাটরাও গঙ্গা জলের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। দ্য হিন্দু পত্রিকায়প্রকাশিত এ
কটি লেখা থেকে জানা যাচ্ছে যে, সম্রাট আকবর নিয়মিত
গঙ্গা জল আনাতেন। সেই
জল মজুত করার ভাল ব্যবস্থাও ছিল। গঙ্গা জলের প্রতি তাঁর এই আকর্ষণের কথা লিপিবদ্ধ
করা আছে।
শুধু আকবরই নন। বাবর ও হুমায়ুনও
ছিলেন গঙ্গা জলের অনুরাগী। তাঁরা মনে করতেন গঙ্গা জল হল অত্যন্ত বিশুদ্ধ। এবং ‘আব এ হায়াত’ বা স্বর্গের জলের পরই গঙ্গা জলকে স্থান দিয়েছিলেন
তাঁরা। এতটাই নির্মল ছিল গঙ্গার জল। মোগল সম্রাটরা গঙ্গা
জলকেই শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। আর, হিন্দুদের মতোই, দ্বিতীয় স্থানে তাঁরা রেখে ছিলেন যমুনার জলকে। যদিও আগ্রা ও দিল্লিতে
তাঁদের দুর্গের পাশ দিয়েই বয়ে যেত যমুনা। হিন্দু শাস্ত্রেও, পবিত্রতার
বিচারে, গঙ্গার পরে দ্বিতীয় স্থানে আছে যমুনা।
দ্বিতীয় পানিপতের যুদ্ধের কথা
আমরা অনেকেই জানি। আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর আগে ১৫৫৬ সালে হয়েছিল সেই যুদ্ধ। দিল্লির
সমনদে তখন রয়েছেন রাজা হেমু। পানিপতে মোগলদের সঙ্গে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধে তিনি মারা
যান। সম্রাট আকবরের বয়স তখন মাত্র ১৩। তাঁর হয়ে মোগল বাহিনীকে
পরিচালনা করেছিলেন সেনাপতি বৈরম খান। সেই যুদ্ধে জখমও হয়েছিলেন
তিনি। কথিত আছে, যুদ্ধ শেষে বৈরম খান ও অন্যান্য মোগল সেনাপ্রধানদের
ক্ষত ধুয়ে দেওয়া হয় গঙ্গা জল দিয়ে। সে কালে তো আর ডেটল, স্যাভলন
বা বেটাডিন ছিল না। তাছাড়া মধ্যযুগের অনেক মুসলমান লেখকের লেখায় রয়েছে গঙ্গার
গুণগান। লক্ষণীয় যে, সেই প্রাচীন কাল থেকে, মধ্যযুগ পেরিয়ে, আজও ভারতের নানান সম্প্রদায়ের মানুষ
গঙ্গার শুদ্ধতা ও শুদ্ধিকরণ ক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে চলেছেন। কেউ ওই নদীকে বসিয়েছেন
দেবীর আসনে। কেউ আবার তাকে তুলনা করেছেন স্বর্গীয় জলধারার সঙ্গে। কিন্তু কেন?
গঙ্গা জলের মাহাত্ম্য কি নেহাতই কাল্পনিক, না
কি তার কোনও বাস্তব ভিত্তি আছে?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পাবমেড সেন্ট্রাল’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা
পত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে, ১৮৯৬ সালে, ব্রিটিশ
জীবাণু বিশেষজ্ঞ আর্নেস্ট হ্যাঙ্কিন প্রথম গঙ্গার শুদ্ধিকরণ ক্ষমতার
কথা জানান। তিনি বলেন গঙ্গা জলের রয়েছে জীবাণু বিনাশকারী শক্তি। বিশেষ করে কলেরার
জীবাণু মারা পড়ে বয়ে চলা গঙ্গা জলে। তার পর, গত শতাব্দীর শুরুতে,
ফরাসি জীব বিজ্ঞানী এম এফ ডি’হেলেরেস নিশ্চিত করে
দেখান যে, গঙ্গা জলের বৈশিষ্ট্য হল তার জীবাণু ধ্বংস করার
ক্ষমতা। গঙ্গা জলে আছে এমন কিছু ভাইরাস যারা জীবাণুদের মেরে ফেলে। পরে এক সময়,
তাদের নাম দেওয়া হয় ‘ব্যাক্টেরিওফ্যাজ’। যথেষ্ট পরিমাণে ব্যাক্টেরিওফ্যাজ থাকার ফলে, গঙ্গার
জলে জীবাণু জন্মালেও তা ধ্বংস হয়ে যায়। অন্য নদীর জলে ব্যাক্টেরিওফ্যাজ থাকলেও,
পরিমাণে তা খুবই কম। তাই আর কোনও নদী গঙ্গার বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে
পারেনি।
কিন্তু গঙ্গা জলেই ব্যাক্টেরিয়া-মারা ভাইরাস
বেশি মাত্রায় পাওয়া যায় কেন? এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।
ভারতের পরিবেশ গবেষণা সংস্থা নিরি’র বিজ্ঞানীরা এখন গঙ্গার
তলদেশ থেকে তুলে আনা পলি বিশ্লেষণ করার কাজে ব্যস্ত। সেখানকার বিজ্ঞানী কৃষ্ণ খাইমার
বলেছেন যে গঙ্গার পলিতে এমন কিছু থাকতে পারে যা ব্যাক্টেরিওফ্যাজের জন্ম দেয়। সেই
বস্তুটি কী, তারই সন্ধান করছেন তাঁরা।
পাবমেড-এ প্রকাশিত তাঁর গবেষণা পত্রে
খাইমার এমনও বলেছেন যে, গঙ্গার উৎসস্থল গোমুখ হিমবাহে হয়ত জমে
আছে প্রাগৈতিহাসিক কালের সব ভাইরাস। যে বরফ-গলা বিন্দু বিন্দু জল গঙ্গা সৃষ্টি
করছে, হয়ত তারই সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে মুক্তি পাচ্ছে আদিম কালের
সেই কোটি কোটি জমে-যাওয়া ভাইরাস। গঙ্গা জলে আবার প্রাণবন্ত হয়ে
উঠছে
তারা। আর জীবাণু বিনাশ করে গঙ্গার জলকে শোধন করে চলেছে নিয়ত। রহস্যভেদ হয়ত হবে
অদূর ভবিষ্যতেই।
ছবি: দেবপ্রয়াগ/পৃথিবীর ডায়েরি

Comments
Post a Comment