প্রাণী নিধনের নতুন ইতিহাস


বিশ্ব ভরা যে বিপুল প্রাণের বৈচিত্র তা যে, ক্রমশই ধ্বংস হচ্ছে, লুপ্ত হচ্ছে তার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে। মানুষ যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে, সে আবিষ্কার করছে বিশাল বিশাল সব প্রাণীদের, যারা নির্ভয়ে তখন পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াতো। কিন্তু সেই দৈত্যাকার প্রাণীরাই একে একে আমাদের এই নীল গ্রহ থেকে হারিয়ে যেতে লাগল। যদিও তখন কোনও বন্দুক ছিল না। ছিল না চোরা শিকারিদের মতো অপরাধী মানুষজনও। তবু তাদের বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে মানুষের হাতই বেশি ছিল কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থাকছে।

  দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ফোব ওয়েস্টনের প্রতিবেদন থেকে যেমন জানা যাচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা সেই জেনিয়রনিসর কথা। যে ছিল ২ মিটার লম্বা, ২০০ কেজি ওজনেরর পৃথিবীর অন্যতম ভারী ওজনের পাখি। অন্যান্য অনেক দৈত্যাকার প্রাণীদের সঙ্গে সেও সেখানে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু সে ৫০,০০০ বছর আগেই পৃথিবীর বুক থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

  আবার উত্তর আমেরিকার দৈত্যাকার আর্মাডিলো, যে আকারে ছোট খাটো একটা গাড়ির মতো। সে কিন্তু ১২,০০০ বছর আগে পর্যন্তও এই পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতো।

  এই রকম ১৭৮ টিরও বেশি বিশাল প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল খ্রিস্টপূর্ব ৫২,০০০ – ৯,০০০ বছরের মধ্যে। দীর্ঘ দিন ধরে অন্তত ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত, মানুষের মনে এই ধারণা ছিল যে, মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে মিলে মিশেই থাকত। এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তনের ফলেই ডাইনোসরের মতো বিরাট প্রাণীরা বুঝি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে ওই বছর জীবাশ্মবিদ পল এস মার্টিন এ বিষয়ে তাঁর বিতর্কিত বক্তব্য প্রকাশ করেন যে, ওই প্রাণীদের বিলুপ্তির জন্য মানুষই দায়ী।

  ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনর প্রফেসর মার্ক মাসলিনর মতে, সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে প্রাচীন মানুষ খাবারের জন্য নির্বিচারে বন্যপ্রাণী শিকার করত। এক সময়ে সেই শিকারেও টান পড়ে। জীববৈচিত্রেও সঙ্কট ঘনিয়ে ওঠে। শেষ তুষার যুগ তখন শেষ হচ্ছে। বাধ্য হয়েই যেন তখন তারা বন্য প্রাণীদের ধরে ঘরে পালন করার চেষ্ট করে। এবং শুরু করে নানা বুনো শস্য ও উদ্ভিদ চাষ করার। ওই ভাবেই চাষাবাদ শুরু হয়েছিল। এবং দেখা গেছে ১৪ টি আলাদা আলাদা জায়গায় মানুষ নিজেদের মতো চাষ শুরু করে, তা প্রায় ১০,৫০০ বছর আগে।

  অবশ্য একথা বলতেই হবে যে, ওই সব প্রজাতিদের নির্বংশ করতে আদিম মানুষদের যখন হাজার হাজার বছর লেগেছিল। সেখানে আধুনিক মানুষ মাত্র কয়েক দশকেই অসংখ্য প্রজাতিকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে। এবং আমরা প্রাণীদের হত্যা করতে করতে তাদের শুধু নিশ্চিহ্নই করে দিচ্ছি না, প্রাকৃতিক মানচিত্র বদলে সমস্ত প্রাকৃতিক পরিবেশটাই ধ্বংস করে দিচ্ছি। মাত্র কিছু বছরের মধ্যেই ওই বদলের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে চাষাবাদ ও পশুপালনই। রাষ্ট্রপুঞ্জ বলছে, বর্তমানে প্রায় ১০ লক্ষ উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্তির মুখে পড়েছে।

  সত্য যে, চাষাবাদের বিস্তৃতি ও জনসংখ্যা একটা ধাক্কা ছিল। তবে পৃথিবীর জীববৈচিত্রের পক্ষে পরের ধাক্কাটা এল ইউরোপিয়ানদের কাছ থেকে। তারা পৃথিবীর নানা দিকে ছড়িয়ে আদিম জন গোষ্ঠীকে মেরে ধরে তাদের উৎখাত করতে লাগল। যারা এত দিন প্রকৃতিতে প্রাণী শিকার ও তাদের সংরক্ষণের মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রেখে চলত। সেই সব জায়গায় গিয়ে ইউরোপিয়ানরা কলোনি গড়ে তুলল। গবেষকরা বলছেন, আমেরিকায় উপনিবেশ গড়ে তোলার জন্যই আদিবাসিদের উৎখাত ও হত্যা করে গেছে তারা। যেমন পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে স্প্যানিসরা দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়ে সেখানকার আদিবাসিদের যেভাবে মেরে তাড়িয়ে কলোনি গড়েছিল তাতে ৫ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিল। যার মধ্যে ৯০%ই ছিল আদিবাসি। আজ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬% আদিবাসি। কিন্তু আশ্চর্য তাঁরাই এই গ্রহের ৮০% জীববৈচিত্র রক্ষা করেন। এবং মানুষের লোভ যে সমস্ত প্রকৃতি পরিবেশ ক্রমশ ধ্বংস করে চলেছে। এই নীল গ্রহের জীববৈচিত্রকে হত্যা করে চলেছে যা, তার বেঁচে থাকাকেই ভবিষতে কঠিন করে তুলবে। সেই বিষয়ে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা মানুষকে বার্তা দিচ্ছেন। সতর্ক করছেন । কিন্তু আমরা সেই সাবধান বাণীতে কর্ণপাত করলে তো। আসলে আমরা নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই তাড়াতাড়ি ডেকে আনছি।

মালবী গুপ্ত

ছবি: ম্যামথ/ উইকিপিডিয়া কমন্স


Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস