পদ্ম ফুলের ইতিকথা: প্রথম ফুটেছিল ১৪৫ কোটি বছর আগে

 


একদা পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়ানো দৈত্যাকার ডায়নোসরের মতো প্রাণীরা প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিম্বা প্রতিকুল আবহাওয়ায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। ম্যামোথরাও বিলীন হল। অথচ আশ্চর্য
, জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা হালকা পলকা ডাঁটার ওপর ফোটা নরম কমল বা পদ্ম ফুল কি করে কোটি কোটি বছর ধরে অযুত ঝড় ঝাপটা সয়ে টিকে গেল এই পৃথিবীতে! অসাধারণ সুন্দর এই জলজ ফুলটি প্রথম ফুটেছিল বাতার পথম জন্ম হয়েছিল নাকি ১৪৫ কোটি ৫০ লক্ষ থেকে ৬৫ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগে। বিজ্ঞানীরা অন্তত তেমনটাই বলছেন। 

না, যুগ যুগ ধরে ঘটে চলা কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই তার অস্তিত্বকে নির্মূল করতে পারেনি। এমনকি বিগত তুষার যুগে যা ১ কোটি ৮০ লক্ষ বছর থেকে ১০,০০০ আগে পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, সেই যুগেও অনন্য এই পদ্ম ফুল কিন্তু হাজারও প্রতিকুলতার সঙ্গে লড়াই করেছে। এবং তার মোকাবিলা করে সে আজও পৃথিবীর বুকে আন্দোলিত হচ্ছে। তবে সত্য যে, পৃথিবীর কোনও কোনও জায়গা থেকে সে উধাও হয়ে গেছে। বর্তমানে সেই সবজায়গা থেকে পাওয়া তার ফসিল বা জীবাশ্ম জানান দেয় যে, একদা সেখানেও তারা প্রস্ফুটিত হত। 

প্রাগৈতিহাসিক যুগের বাসিন্দা এই পদ্মের বহু মানুষের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন প্রাচ্যের হিন্দু বৌদ্ধ ইত্যাদি কিছু ধর্মে সে উর্বরতা ও সহিষ্ণুতার প্রতীক হিসেবে মান্যতা পায়। কোনও কোনও ধর্মগুরু তো পদ্মফুলকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থায়িত্বের প্রতীক জ্ঞান করেন। আর প্রস্ফুটিত পদ্মের ওপর আসীন দেবদেবীরা তো আমাদের খুব চেনা। তবে আমাদের মনে হতেই পারে যে, ওই বিশাল প্রাণীরা যে পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারেনি, সেখানে ওই পদ্ম কি করে কোটি কোটি বছর উজিয়ে আজও আকাশের দিকে মুখ তুলে থাকতে পারে। 

আসলে তার এই টিকে থাকার রহস্য তার বীজের মধ্যেই আছে। যে বীজ হাজার হাজার বছর ধরে এমনকি জল ছাড়াও বেঁচে থাকতে পারে। দেখা গেছে যত বিধ্বংসী প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটুক না কেন পদ্মের যেন তাতে কিছু আসে যায় না। সে কোথাও না কোথাও, কোনও না কোনও ভাবে ঠিকই প্রকৃতিতে থেকে যায়। তাছাড়া পদ্ম ফুল অত্যন্ত শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ীও বটে। এর কিছুটা নমুনা পাওয়া গিয়েছিল ১৯৫৪ সালে চিনের ইয়াংসে নদীর অববাহিকায় ভয়াবহ প্লাবনের সময়। সেই সময় ওই অঞ্চলের সমস্ত পদ্মের শিকড় বাকড় ছিঁড়ে একেবারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এবং সেই পরিস্থিতি চলেছিল ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত, যত দিন না সেখানে বন্যার জল নেমে যায়। এবং নদীর জলতল যখনই স্বাভাবিক অবস্থায় পেঁৗছল, তখন দেখা গেল লেকের অগভীর জলে তারা আবার ফুটতে লাগল বিপুল সংখ্যায়। যেন কোথাও কিছু ঘটেনি। সবই ছিল স্বাভাবিক। আসলে পদ্ম গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও তাদের বীজ ইতস্তত ছড়িয়ে গিয়েছিল নানা জায়গায়। তারাই অঙ্কুরিত হল পরে। এবং আবার পদ্মফুলের রঙিন ছটায় দিগন্ত আলোকিত হতে লাগল। বিপুল তার জীবনীশক্তি।

এছাড়া জানা গেছে, পদ্ম জলকে পরিশুদ্ধ করে। দূষণও প্রতিহত করতে পারে সে। তবে রাত হলেই সে জলের নীচে ডুব দেয়। আর সকালে সূর্যের উদয় হলেই আবার জলের ওপর সে মাথা তুলে দাঁড়ায়। সব আবহাওয়ায় পদ্ম

বেশ মানিয়ে নিতে পারে। তাই ভারত চিন ইরান রাশিয়া অস্ট্রেলিয়া সর্বত্রই তার ফুটে ওঠায় কোনও বাধা নেই। তবে জল কাদা মাটি বা জলাভূমিই তার পছন্দের জায়গা। অবশ্য দেখা গেছে বরফের নীচেও বছরের পর বছর সে অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। আবার প্রখর তাপও সহ্য করতে পারে সে। আশ্চর্য ফুল বটে। ভারত ও ভিয়েতনাম দুদেশেরই জাতীয় ফুল পদ্ম।

মালবী গুপ্ত

ছবি: উইকিপিডিয়া/হঙ ঝাং




Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস