এবার রেকর্ড ভাঙ্গল সিও-২
বেড়েই চলেছে, সে বেড়েই চলেছে। তাকে নিয়ন্ত্রণের
জন্য বিশ্ব জুড়ে কত বৈঠক, কত চুক্তি। কিন্তু লাগাম ছাড়া
গতিতে তার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে আমাদের বায়ু মন্ডলে, যা
পৃথিবীকে ক্রমশ গরম করে তুলছে। সে কার্বন ডাইঅক্সাইড বা
সিও-২। এবং গত মে মাসে সে সমস্ত রেকর্ডই ভেঙে ফেলেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শিল্প যুগ শুরুর আগে বায়ুমন্ডলে গড়ে যে পরিমাণ সিও টু থাকত, বর্তমানে তার থেকে ৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে।
আসলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, যানবাহন, ফার্ম ও অন্যান্য নানা উৎস থেকে বেরিয়ে আসা
কার্বন ডাইঅক্সাইড বায়ুমন্ডলে বিপুল পরিমাণে মিশে যাচ্ছে। ২০২১ সালে বাতাসে ওই
কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা ছিল ৩৬২০ কোটি টন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ।
আর বাতাসে এই সিও টু’র মাত্রা বেড়ে পৃথিবী যত গরম হয়ে উঠছে,
ততই প্রকৃতিতে অঘটনও ঘটছে বেশি।
বর্তমানে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ১.১ ডিগ্রি
সেলসিয়াস যা শিল্প যুগের আগের থেকে বেশি। এবং প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী এই তাপমাত্রা
কমানোর যে লক্ষ্য মাত্রাই ঠিক করা হোক না কেন দেখা যাচ্ছে, তা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তে
প্রবল তাপপ্রবাহ বেড়েছে। তার প্রভাবে বিশেষ করে ইউরোপে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
দাবানল ও খরায় জ্বলছে অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা সহ এশিয়ার নানা
দেশ। ইরাকের লেক সোয়া শুকিয়ে গেছে। যে সব দেশে বা রাজ্যে আগে বন্যার প্রকোপ ছিল না,
সে সব অঞ্চলও বন্যায় ভাসছে। ভারতের কেরল, রাজস্থান
ইত্যাদি রাজ্যে বন্যা হতই না, এখন বছর বছর সেখানে বন্যা
হচ্ছে।
আর পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়তে থাকায় মেরু প্রদেশ ও অন্যান্য অঞ্চলের হিমবাহের বরফ গলছে। সেই গলা জলে উঁচু হয়ে উঠছে সমুদের জলতল। দেখা যাচ্ছে ১৮৭০ সালে পৃথিবীর সমুদ্রতল যা ছিল তার থেকে ৮ ইঞ্চি উঁচু হয়ে গেছে। এবং বলা হচ্ছে ২১০০ সাল নাগাদ ওই জল তল ৮ ফিট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এই শতাব্দীর মাঝামাঝিই বরফ শূন্য হয়ে যেতে পারে মেরু সাগর।
কোভিড ১৯’র প্রভাবে
২০২০ তে বাতাসে সিও টু’র মাত্রা কোথাও কোথাও একটু কমেছিল
বটে। কিন্তু তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। যে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোকে এ
ব্যাপারে প্রধান কালপ্রিট মনে করা হয়, তা পোড়ানো অব্যাহতই
রয়েছে। ফলে ৪০ লক্ষ বছরের ইতিহাসে বাতাসে তার মাত্রা এখন সবচেয়ে বেশি। যা ভবিষ্যৎ
বিপর্যয়কে প্রায় অনিবার্য করে তুলছে।
মালবী গুপ্ত
বরফে ঢাকা আল্পস সবুজ হয়ে যাচ্ছে
সাদা বরফে ঢাকা আল্প্স পর্বতমালা ক্রমশ সবুজ
হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ‘সায়েন্স’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত নতুন একটি গবেষণা রিপোর্ট তেমনটাই বলছে। তবে খবরটা
বোধহয় খুব একটা সুখের নয়। কারণ গবেষকরা দেখছেন আল্প্স’র ১০%
বরফ গলে যাচ্ছে। এমনিতে মনে হতে পারে ১০ শতাংশ আর এমন কি? কিন্তু
ওই পর্বতমালায় জমা বরফই তো অসংখ্য মানুষের পানীয় জলের উৎস।
আল্পস পর্বতমালা ইউরোপের সর্বোচ্চ ও বিস্তৃত
অঞ্চল জুড়ে রয়েছে। এনবিসিনিউজ.কম’র একটি প্রতিবেদন থেকে
আরও জানা যাচ্ছে যে, ইউরোপের ৪০% জলের উৎসও সে। হয়তো সেই
কারণেই আল্প্সকে ইউরোপের ‘ওয়াটার টাওয়ার’ বলা হয়। সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও গবেষণা
পত্রটির লেখক সাবিন রাম্ফ’র মতে, এমন
নয় যে, আল্প্সে বরফ কমতে থাকলে আগামী কাল থেকেই ইউরোপে জল কম
মিলবে। তবে এটা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, এই প্রবণতাটা
দীর্ঘস্থায়ী হবে। আসলে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে মানুষ শুনছেন, জানছেন বটে। কিন্তু তার পরিণতি কি সেটা তো সঙ্গে সঙ্গে চোখে দেখা যাচ্ছে
না। অথচ এটা সত্য যে, বিশ্বের তাপমাত্রা গড়ে যে হারে বাড়ছে,
তার দ্বিগুণ মাত্রায় বাড়ছে পর্বতমালাগুলির তাপমাত্রা। যেগুলিকে
জীববৈচিত্রের ভান্ডার বলা যেতে পারে। কিন্তু তাপ মাত্রা বাড়ার ফলে সেখানকার বরফ
গলছে। আর সেইসব অঞ্চল ক্রমে সবুজ হয়ে উঠছে।
আর সবুজ হওয়া মানেই তাপমাত্রা সেখানে বাড়ছে
এবং বরফ গলছে। তাই বোধহয় বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অদূর
ভবিষ্যতে আল্প্স আর শীতকালীন খেলাধূলার গন্তব্য থাকতে পারবে কি না।
আমাদের কার্বন পদচিহ্ন ছোট হবে কি?
আপনি হয়ত জলবায়ু বদল সম্পর্কে অনেক কথা
শুনেছেন। হয়তো শুনেছেন কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা কর্বন পদচিহ্নের কথা। কিন্তু এই
পদচিহ্ন বা পায়ের ছাপ আসলে কী? আমাদের কাজকর্মের ফলে
পরিবেশে কর্বনের যে ছাপ পড়ছে, তা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়
কার্বন ফুটপ্রিন্টটি। আমরা যা করি, তার থেকেই নির্গত হয়
কার্বন। এই কার্বন হল কার্বন ডাইঅক্সাউড গ্যাসের একটি উপাদান। জীবাশ্ম জ্বালানি,
যেমন পেট্রলিয়াম, কয়লা ইত্যাদি পুড়িয়ে আমরা
প্রকৃতিতে কর্বন ছড়িয়ে দিচ্ছি। এগুলি যত বেশি পোড়াচ্ছি, আমাদের
কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা পায়ের ছাপ তত বড় হচ্ছে।
যাঁরা নিজেদের গাড়ি চড়েন তাঁরা হয়তো ভাবছেন, ইঞ্জিন চালানোর জন্য তেল পেড়ানোর ফলে যতটুকু কার্বন বের হচ্ছে, সেটুকু কার্বনই তাঁরা পারিবেশে ছড়াচ্ছেন। না, এটা
ঠিক নয়। খনির তেল তোলা থেকে, গাড়ির ইঞ্জিন চলার ফলে, যে কার্বন নির্গত হয়, তার পুরটাই কর্বন ফুটপ্রিন্টের
অংশ। খনি থেকে তেল তোলা, তার শোধন, তেলের
পাম্প অবধি তার পরিবহন Ñ সব ক্ষেত্রেই
জ্বালানি পুড়ছে। কার্বন বের হচ্ছে। এছাড়া গাড়ি তৈরির সময়ও
কার্বন নির্গত হচ্ছে পরিবেশে। আপনি বোধহয় এতটা ভাবেননি! যতটা ভেবেছিলেন তার থেকে
অনেক বেশি নির্গত হচ্ছে আমাদের কাজে।
তাই প্রত্যেকটি কাজ ও আপনার কাছে থাকা সব
সামগ্রীর নিজস্ব কার্বন ফুটপ্রিন্ট রয়েছে। ধরুন কেউ বই পড়ছে। বই তৈরির জন্য কাগজ, তার ছাপাই, বাঁধাই, সরবরাহ
থেকে পাঠকের হাতে আসা অবধি সব কাজেই কর্বন পদচিহ্ন। আমরা যে ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজি,
অথবা যোজন দূর থেকে আনা ফল, খাবার খাচ্ছি Ñ
তাতেও বের হচ্ছে কার্বন। তাহলে যা দাঁড়ালো, কার্বন
নির্গমন না করে আমরা কোনও কাজই করতে পারি না। এবার হয়তো অনেকে বলবেন, সব কাজে যখন কার্বন বেরচ্ছে তখন আমাদের আর কি করার আছে? যেমন চলছে, তেমনই চলুক। না, আমাদের
অনেক কিছু করার আছে, এই পায়ের ছাপ ছোট করার জন্য। লাভ ও লোভের
উন্নয়নের বিপরীতে আমাদের কাজ, পছন্দ, পরিমিতি
বোধ, এই পদচিহ্নের অনেকটাই ছোট করতে পারে।
সুব্রত কুণ্ডু/পরিষেবা
ছবি: উইকিপিডয়া কমন্স


Comments
Post a Comment