শরীরকে ত্যাগ করে চলে যায় মাথা

 


গুপি-বাঘার মনে একবার বেজায় দুশ্চিন্তা ঘনিয়ে উঠে ছিল? ‘মুণ্ডু গেলে খাবটা কী/মুণ্ড গেলে বাঁচব নাকি?’ এমনই এক ঘোরতর চিন্তায় তারা মুষড়ে পড়ে ছিল এক সময়।  সত্যিই তো, ধড়ে মুণ্ডটাই যদি না থকে, তা হলে প্রাণটা তো যাবে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বড় অফসোসের কথা, হাঁড়ি হাঁড়ি মণ্ডা-মিঠাই যে আর খাওয়াই যাবে না!

কিন্তু এমনও তো হতে পারত যে, মুণ্ডগুলি আলাদা হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এদিক ওদিক ভেসে ভেসে পোলাও কালিয়া মণ্ডা-মিঠাই খেয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা বজায় থাকত সেগুলির। না, তেমনটা হওয়া মোটেই অসম্ভব ছিল না। ভুতের রাজা তেমন বর দিলে, নিশ্চয়ই তা সম্ভব হত।

তাই মনে হয়, ভূতের রাজা বোধহয় তেমনই এক বর দিয়ে ছিলেন সমুদ্রের স্লাগদের। ধড় থেকে মুণ্ড আলাদা হয়ে গেলেও, তাদের খাওয়া দাওয়ায় কোনও কমতি দেখা দেয় না।

স্লাগরা হল শামুকের মতো এক প্রাণী। দুয়ের মধ্যে তফাৎটা হলো এই যে, শামুকের একটা খোল থাকে, স্লাগের তা থাকে না। স্লাগ হলো এক বিস্ময়কর প্রাণী। প্রয়োজন বোধ করলে, তারা অনায়াসে তাদের মাথাটা শরীর থেকে আলাদা করে ফেলতে পারে (ছবি)। শরীরটাকে ফেলে দিয়ে মাথাটা দিব্বি চলে ফিরে বেড়ায়।
জাপানের নারা উইমেনস ইউনিভারসিটিরগবেষক সায়াকা মিতোহ ও ইয়োইচি ইউসা এমনটাই দেখেছেন। তাঁদের গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয় ‘কারেন্ট বায়োলজি’ জার্নালে।

যে প্রজাতির স্লাগ এই ক্ষমতা ধরে, সেটির নাম ‘এলিসিয়া মারজিনাটা’। প্রয়োজন দেখা দিলে, বিশেষ করে যদি তাদের শরীর কোনও পরজীবীর দ্বারা আক্রান্তু হয়, তা হলে তারা সেই শরীর হেলায় পরিত্যাগ করে। তাদের মাথা শরীরের বাকি অংশ থেকে আলাদা হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মুণ্ডটা সমুদ্রের জলে ভেসে বেড়ায়। খায়দায়। আর সেই সঙ্গে একটু একটু করে আবার গজাতে থাকে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এবং মাত্র ২০ দিনের মাথায় ধড়হীন মুণ্ডটা, হৃদপিণ্ড সমেত, পেয়ে যায় একটি নতুন ঝাঁ চকচকে জলজ্যান্ত শরীর।

প্রকৃতি কেবল স্লাগদেরই এমন বর দিয়েছে, তা নয়। এক ধরনের কেঁচো আছে। তাদের নাম ‘প্লেনারিয়ান’। তাদের কেটে টুকরো টুকরো করে দিলেও, প্রতিটা টুকরো থেকে আবার একটা করে নতুন কেঁচো গজিয়ে ওঠে। তবে তাদের শরীরের গঠন বেশ সাদামাটা। তাদের হৃদপিন্ডও নেই। আর গিরগিটির মতো প্রাণী স্যালাম্যান্ডারের লেজ বা পা কাটা গেলে, তাদের আবার নতুন লেজ বা পা গজায়। কিন্তু ছিন্ন মাথা থেকে পুরো শরীরটা পুনর্গঠন করার ক্ষমতা তাদের নেই।

গবেষকরা দেখেন স্লাগদের ক্ষেত্রে তাদের মাথার পক্ষে বাকি শরীর থেকে আলাদা হয়ে যেতে বেশ খানিকটা সময় লাগে। তাই তাঁরা মনে করছেন, যে, শত্রুর হাতে থেকে বাঁচার জন্য প্রকৃতি তাদের ওই ক্ষমতা দিয়েছে, তেমনটা নয়। তাঁরা বলছেন, শরীরে কোনও পরজীবী বাসা বাঁধলে, মাথাটি তার নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য, আক্রান্ত শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়।

ছিন্নমস্তা, পরিত্যক্ত শরীরটি কিন্তু সহজে মরে না। সেগুলি অনেক দিন, এমনকি কয়েক মাস, বেঁচে থাকে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। কিন্তু সেগুলিতে আর নতুন মাথা গজায় না। এবং নিস্তেজ হতে হতে সেগুলি একসময় নিষ্প্রাণ হয়ে যায়।

ছবি ও সূত্র: সায়েন্স নিউজ

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস