সূর্য’র কাছে পৌঁছে গেছে মহাকাশযান পার্কার
সূর্যের পরিমন্ডলে পৌঁছে গেছে পার্কার। এই প্রথম, মানুষের পাঠানো কোনও মহাকাশযান সূর্যের কাছাকছি পৌঁছল। যে সূর্য আমাদের আলো দেয়, উত্তাপ দেয়, প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করে, আর আমাদের পৃথিবীকে নিজের সৌরজগতে আটকে রাখে তার নিজস্ব আকর্ষণে, সেই অগ্নিগোলকের মতো নক্ষত্রটি কেমন? এই প্রশ্ন তো মানুষ অনাদি কাল থেকে করে আসছে। তারই উত্তর খুঁজতে পার্কার গেছে সূর্যের কাছে।
চাঁদ ও মঙ্গলকে জানতে কেউ না কেউ মাঝেমাঝেই মহাকাশযান পাঠাচ্ছে তাদের লক্ষ্য করে। শুক্র গ্রহ সম্পর্কেও জানার আগ্রহে সেখানে গবেষণাযান গেছে নিয়মিত। আমাদের সৌরমন্ডলের বাইরে যে এক অসীম, অজানা শূন্যতার জগৎ রয়েছে, সেটি সম্পর্কে ধারণা করার জন্যও সেখানে এখন ভেসে চলেছে ভয়জার-১। ইন্টারস্টেলার স্পেস বা আন্তর্নাক্ষত্রিক মহাকাশ বা নক্ষত্রলোকে সেই যাত্রার কোনও শেষ নেই। ভয়জার-১ ভেসে চলবে অনন্তকাল। যতদিন না তার যান্ত্রিক চোখ, কান, নাক ও হৃৎপিণ্ড সমেত সে ভষ্মীভূত হয়ে যাচ্ছে কোনও এক তারার আগুনে। তবুও তার ভস্ম ভেসে থাকবে মহাকাশে। কিম্বা এক সময় তা চলে যাবে অতিকায় কোনও কৃষ্ণগহ্বরের অন্দরমহলে।
মহাকাশ যান পার্কার’র সূর্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা, এই বিস্মকর ব্রহ্মাণ্ডকে জানার প্রয়াসেরই অঙ্গ। ১২ অগাস্ট ২০১৮ সালে পার্কার সূর্যের উদ্দেশ্যে পৃথিবী থেকে রওয়ানা হয়। মানুষের তৈরি সব চেয়ে দ্রুতগামী মহাকাশ যান সেটি। ঘন্টায় ৬ লক্ষ ৯০ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে। বিখ্যাত সৌর বিজ্ঞানী ইউজিন নিউম্যান পার্কার’র নামে মহাকাশ যানটির নামকরণ করা হয়েছে। ইউজিন পার্কার হলেন প্রথম বিজ্ঞানী যিনি বলে ছিলেন সৌর ঝড়ের কথা। সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে ছিটকে বেরতে থাকে কিছু পদার্থের কণা। সেগুলি ক্রমশ এতই গরম হয়ে উঠতে থাকে যে, সূর্যের প্রচণ্ড মাধ্যাকর্ষণও সেই তপ্ত কণার স্রোতকে আটকে রাখতে পারে না নিজের কাছে। সূর্যের পরিমন্ডল ছাড়িয়ে সেই পদার্থের কণা প্রবল গতিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে মহাশূন্যে। অনেকটা মরুভূমি থেকে ধেয়ে আসা অন্ধকার-করা ধুলোর ঝড়ের মতো। সেই সৌর ঝড়ের প্রভাব পৃথিবীর ওপরও পড়ে। বিশেষ করে তার প্রভাব পড়ে পৃথিবীর আবহাওয়া আর পৃথিবীকে প্রদক্ষিণরত উপগ্রহগুলির ওপর। মহাকাশ যানটির অ্যান্টেনার তলায় লাগানো আছে একটি মেমরি কার্ড। তাতে রয়েছে প্রায় ১১ লক্ষ মানুষের নাম। আর রয়েছে ইউজিন পার্কারের গবেষণা পত্রের একটি প্রতিলিপি। পৃথিবীর দূত হিসেবে পার্কার মহকাশযান সূর্যের কাছে নিয়ে যাচ্ছে ওই তথ্য।
যখন মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণহীন মহাশূন্য থেকে সূর্যের পরিমÐলে প্রবেশ করল পার্কার, সেই সময় বেশ কিছু পরিবর্তন ধরা পড়ল তার যন্ত্রে। বোঝা গেল, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে সে। এবার সে সেখানকার তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করবে। সেগুলি থেকে সূর্য সম্পর্কে জানা যাবে অনেক অজানা কথা।
বিজ্ঞানী আর ইঞ্জিনিয়াররা মিলে পার্কারকে এমন ভাবে তৈরি করেছেন যে সে সূর্যের প্রবল উত্তাপ সইতে পারে। অন্তত এখনও পর্যন্ত তার কলকব্জা সব ঠিক চলছে। সূর্যের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট হল, তার পৃষ্ঠের ওপর মাত্রা ৫,৫৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু তার করোনার বা পরিমনবডলের তাপ অনেক বেশি - যা প্রায় ৫৫,৫৫,৫৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যেতে পারে। ব্যাপারটা হল এই রকম। ধরা যাক, শীতের রাতে কাঠকুটো জ্বেলে আগুন পোহাচ্ছেন। মনে হল গরমটা একটু বেশিই লাগছে। তাই আগুন থেকে পাঁচ হাত পেছিয়ে বসলেন। কিন্তু সেখানে যেন তাপটা আরও বেড়ে গেল! তাই দশ হাত পেছিয়ে গেলেন এবার। কিন্তু উত্তাপ যেন সেখানে বেড়ে গেল আরও। আগুন থেকে যতই দূরে সরে যান আপনি, উত্তাপ ততই বাড়তে থাকে। সূর্যের ক্ষেত্রে এমনটাই ঘটে। তার পৃষ্ঠ থেকে তার পরিমন্ডলের তাপ অনেক বেশি। কেন এমনটা হয়? সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবে পার্কার।
আরও একটা বড় রহস্য ঘিরে আছে সূর্যকে। যে পদার্থের কণা তার পরিমÐল থেকে বেরিয়ে যায়, সেগুলির গতি ক্রমশ বাড়তে থাকে। সাইকেল চালানোর সময় জোরে প্যাডেল করলে তবেই গতি বাড়ে। গাড়ির অ্যাক্সিলেটরে চাপ দিলে তবেই তার গতি দ্রæত থেকে দ্রুততর হয়। অর্থাৎ, বেশি শক্তি প্রয়োগ করলে তবেই হয় গতি বৃদ্ধি। সূর্য থেকে ছিটকে যাওয়া পদার্থের কণা তাদের ছুটে চলার গতি বাড়ায় কী করে? মহাকাশের মহাশূন্যে সেগুলি বাড়তি শক্তি সঞ্চয় করে কোথা থেকে? এ সব প্রশ্নের উত্তর এখনও জানা নেই।
তাই পার্কার গেছে সূর্যের কাছে উত্তরটা জানতে।
https://www.sciencealert.com/the-footage-from-the-first-spacecraft-to-fly-through-the-sun-s-corona-is-insane
Comments
Post a Comment