জল, স্থল, অন্তরিক্ষ ভরে উঠছে জঞ্জালে
প্রকৃতি পাহাড় সৃষ্টি করেছে। এশিয়ার হিমালয়, দক্ষিণ আমেরিকার অ্যান্ডিজ, উত্তর আমেরিকার রকিজ, ইয়োরোপের অ্যাল্পস আর আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো। এই সব বিরাট, বরফের মুকুট পরা পাহাড়গুলি প্রকৃতির তৈরি। প্রকৃতির এই সৃষ্টিগুলি এতই সুন্দর, এতই রোমাঞ্চকর ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা যে, তাদের আকর্ষণে যুগে যুগে, দলে দলে, মানুষ গিয়েছে তাদের কাছে। তাদের দেখতে। তাদের শোভা উপভোগ করতে। তাদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে নিজেদের মন আর শরীরকে আবার চাঙ্গা করে তোলার আশায়।
মানুষও কিন্তু দিকে দিকে পাহাড় সৃষ্টি করে চলেছে। তবে তা জঞ্জালের পাহাড় !
একটা হিসেব বলছে, প্রতি বছর, বিশ্বজুড়ে মানুষ ৪.৫ ট্রিলিয়ন পাউন্ড বা ২.০৪ ট্রিলিয়ন কিলোগ্রাম জঞ্জাল সৃষ্টি করে। এই ওজনটা ঠিক কত ভারি, তা আমরা অনুমান করতে পারব না। তার ওপর বিশ্ব ব্যাঙ্কের সমীক্ষা বলছে যে, ২০৫০’এর মধ্যে ওই জঞ্জালের পরিমাণ আরও ৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
তার মানে, আর মাত্র ২৮ বছরের মধ্যেই, জঞ্জালের পাহাড় প্রায় দ্বিগুণ হতে চলেছে।
সব
দেশের মানুষ সমান হারে আবর্জনা সৃষ্টি করে না। কোনও কোনও দেশে বেশি হয়, কোনও কোনও দেশে কম। বিশ্ব ব্যাঙ্কের হিসেব অনুযায়ী, ধনী দেশগুলির মানুষ বিশ্বের প্রায় ৩৪ শতাংশ জঞ্জাল সৃষ্টি করেন। অথচ সে সব দেশের জনসংখ্যা খুবই কম। বিশ্বের মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ বাস করেন সে সব দেশে। যেমন, একজন মার্কিন নাগরিক বছরে প্রায় ৮০০ কেজি বা প্রায় এক টন জঞ্জাল সৃষ্টি করে থাকেন। বিশ্ব ব্যাঙ্ক বলছে, ধনী দেশ ও গরিব দেশে যে জঞ্জাল সৃষ্টি হয়, তার চরিত্রও আলাদা। উন্নত দেশগুলিতে যে জঞ্জাল সৃষ্টি হয়, তার বেশির ভাগটা রিসাইকেল বা আবার ব্যবহার যোগ্য করে তোলা যায়। তার মানে, সেগুলি পচনশীল নয়। কিন্তু সেই আবর্জনা রিসাইকেল করতে লাগে প্রযুক্তি ও প্রচুর এনার্জি বা শক্তি। অপর দিকে, অন্নুত দেশগুলিতে যে জঞ্জাল সৃষ্টি হয়, তার বেশিটাই রিসাইকেল করা যায় না। অর্থাৎ, সেগুলি জৈব বর্জ্য ও পচনশীল। সময়ের সঙ্গে সেগুলি মাটিতে মিশে যায়। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এখন প্লাস্টিকের ব্যবহার দ্রæত হারে বাড়ছে। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে বর্জ্যরে পরিমাণ।
মানুষের তৈরি এই জঞ্জাল কেবল স্থলেই পর্বতপ্রমাণ আকার ধারণ করছে তাই নয়। জঞ্জাল সমুদ্রে সৃষ্টি করছে আবর্জনার চাক। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয়, সমুদ্রের বুকে সৃষ্টি হয়েছে জঞ্জালের ভাসমান দ্বীপ। প্রশান্ত মহাসাগরে এই রকম দু’টি দ্বীপ আকারে ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে প্রকাশিত এক লেখা থেকে আমরা এ কথা জানতে পেরেছি।
আবর্জনার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পথটা কেউই এখনও বাতলাতে পারেন নি। চিন্তাভাবনা চলছে। গবেষণারও কোনও বিরাম নেই। কিন্তু উপায় কিছুই বেরচ্ছে না। অন্তত সমাধানের কোনও ইঙ্গিত লক্ষ করা যাচ্ছে না এখনও। সহজ কোনও পন্থা না পেয়ে কেউ কেউ বলছেন, চিন্তা নেই, এমন দিন আসবে যখন আমরা পৃথিবীর সব জঞ্জাল মহাকাশে নিয়ে গিয়ে ফেলব।
এবং এই কল্পিত উপায় বাস্তবায়িত করা যায় কিনা, তা নিয়ে হিসেব-নিকেশও করা হয়েছে। দেখা গেছে, এ কাজের খরচ আকাশচুম্বী। বিশ্বের সব দেশ মিলেও তা বহন করতে পারবে না।
বাস্তবে কিন্তু আমারা মহাশূন্যে ইতিমধ্যেই জঞ্জাল ছড়িয়ে চলেছি। সেখানে বিকল, অকেজো উপগ্রহের সংখ্যা তো ক্রমেই বাড়ছে । মার্কিন গবেষণাকেন্দ্র নাসা জানাচ্ছে যে, পৃথিবীর কাছে মহাশূন্যে, ক্রিকেট বলের আয়তনের ২৩,০০০
আবর্জনার টুকর পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। সেগুলি প্রায় ২৮ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে। মারবেলের আয়তনের জঞ্জাল রয়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষ। আর নাসার হিসেব
মতো এক মিলিমিটার লম্বা জঞ্জালের টুকর মহাকাশে রয়েছে প্রায় ১০ কোটি।
প্রচন্ড গতিতে ছুটে চলা ওই এক মিলিমিটারের টুকরও যথেষ্ট ক্ষতি করতে পারে। সেগুলির ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় মহাকাশ যান স্পেস শাটল’র বেশ কয়েকটি জানলার কাঁচ। সেগুলি বদলাতে হয়।
১৯৯৬ সালে, এক বড় ধরনের অঘটন ঘটে যায়। একটি ফরাসি উপগ্রহ, একটি রকেটের ভগনাংশের ধাক্কায় চুরমার হয়ে যায় সে বছর। ওই ঘটনার ১০ বছর আগে ফরাসিদেরই পাঠানো একটি রকেট মহাকাশে ফেটে যায়। সেটিরই একটা টুকর ধাক্কা মারে উপগ্রহটিকে। সেটি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলে, আরও অনেক জঞ্জালের টুকর যোগ হয় মহাকাশে।
২০০৯ সালে. একটি বিকল রুশ মহাকাশ যান ধাক্কা মারে একটি মার্কিন মহাকাশযানকে। তার ফলে, ২,৩০০ ছোট-বড় টুকর ছিটকে যায় মহাকাশে। তার আগে, ২০০৭’এ চিন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করার একটি পুরনো উপগ্রহকে রকেট নিক্ষেপ করে উড়িয়ে দেয়। তার ফলে প্রায় ৩,৫০০ ভাঙ্গা টুকর ছড়ায় মহাকাশে।
জলে, স্থলে, অন্তরিক্ষে নির্বিচারে জঞ্জাল ছড়িয়ে চলেছি আমরা। অবর্জনার উৎসটি আসলে বোধ হয় আমাদের মগজে।
Comments
Post a Comment