শিম্পাঞ্জি কেন মানুষ হল না, বা মানুষ শিম্পাঞ্জি
আমরা কেন শিম্পাঞ্জি হলাম না? বা শিম্পাঞ্জিরা মানুষ? একটা
সময় তো আমরা কেউই ছিলাম না। পৃথিবীতে না ছিল শিম্পাঞ্জি, না ছিল মানুষ। ছিল তাদের এক
পূর্বপ্রাণী। এক অ্যানসেস্টার। অ্যানসেস্টার একটি ইংরেজি শব্দ। তার বাংলা প্রতিশব্দ
খুঁজে পেতে যা পাওয়া গেল, তা হল ‘পূর্বপুরুষ’।
পূর্বপুরুষ কেন? ‘পূর্বনারী’ও তো বলা যেতে পারত। ভাষার নানা শব্দ আর শব্দবন্ধের
মধ্যে দিয়ে লিঙ্গ বৈষম্য এই ভাবে চলতে থাকে। তাই ‘পূর্বজন’বলাই ভাল। এই শব্দটি পক্ষপাতদুষ্ট
নয়।
আমাদের উভয়েরই সেই পূর্বজন এই পৃথিবীতে বাস করতেন প্রায় ৬০
লক্ষ বছর আগে। তারপর, বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে দুটি ধারায় ভাগ হয়ে যায় তাঁর উত্তরসূরিরা।
একটি ধারা থেকে আসে আজকের শিম্পাঞ্জি। আর অন্যটি থেকে মানুষ। আমরা জেনেছি যে, এই পৃথিবীর
তামাম প্রাণীকুলের মধ্যে শিম্পাঞ্জিরাই হল মানুষের নিকটতম আত্মীয়। মাত্র কয়েকটা জিনের
তফাৎ, আমাদের আলাদা করেছে। শরীরের গঠনে আমারা যতটা না আলাদা, তার চেয়েও বেশি তফাৎ হল
আমাদের মগজের ক্ষমতায়। মানুষ আর শিম্পাঞ্জির মধ্যে ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণে অনেক
মিল আছে। শিশু শিম্পাঞ্জি ও মানুষের বাচ্চার বড় হয়ে ওঠার মধ্যে মিলটা বেশ লক্ষণীয়।
কিন্তু বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে, দুই প্রাণীর মস্তিষ্কের ক্ষমতায় এক বিরাট ফারাক তৈরি
হতে থাকে। শিম্পাঞ্জির মস্তিষ্ক তাকে প্রকৃতির অঙ্গ করে রাখে। সে থাকে প্রকৃতির নিয়মের
মধ্যে আবদ্ধ। সেই নিয়ম সে ভাঙে না। কারণ, নিয়ম ভাঙ্গার উপায়গুলি তার জানা নেই। আর মানুষের
মস্তিষ্ক তাকে প্রকৃতি থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করে। আর সেই সঙ্গে প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ
কায়েম করতে উদ্ভুদ্ধ করে তাকে। শিম্পাঞ্জি বনেবাদাড়ে থাকে। গাছই তাদের ঘরবাড়ি। দু’চারটে
ডালপালা যে তারা ভাঙ্গে না, এমন নয়। কিন্তু গাছের পর গাছ কেটে, অরণ্যের পর অরণ্য ধ্বংস
করার পক্ষে যুক্তি খাড়া করতে পারে না তার মগজ। কিন্তু মানুষকে চালনা করে যে মস্তিষ্ক,
সেই যন্ত্র বা কম্পিউটারটি প্রকৃতিকে কলুষিত ও নিঃশেষ করার পক্ষে হাজারও যুক্তি, তত্ত্ব
আর গপ্পো খাড়া করে চলেছে যুগ যুগ ধরে। আজ, ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও, প্রকৃতির নিয়ম
মেনে চলার তেমন কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না মানুষের মধ্যে। “মানতে হবে, মানতে হবে”,
এই বলে কেউ কেউ আওয়াজ তুলছেন আজ কয়েক দশক ধরে। কিন্তু সেই দাবি বা আবেদন উপেক্ষা করে
চলেছেন বিশ্বের ক্ষমতাশালীরা।
শিস্পাঞ্জি আর মানুষের মস্তিষ্কের এই বিরাট তফাতের পেছনে কারণটা
বেশ বিস্ময়কর। সুইডেনের লুন্ড ইউনিভারসিটির গবেষকরা দেখেছেন যে দুই প্রাণীর মস্তিষ্কের
কোষগুলি তৈরি করে যে ডিএনএ, দুই প্রাণীর ক্ষেত্রে সেগুলির ব্যবহার আলাদা। ডিএনএর মধ্যে
থাকে অসংখ তথ্য। লেখা থাকে, কী ভাবে কি করতে হবে। ডিএনএ এতই ছোট যে, তা খালি চোখে দেখা
যায় না। কোষের নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকা ওই ডিএনএ দেখতে হলে লাগে বেশ শক্তিশালী অনুবীক্ষণ
যন্ত্র। বলা হয়, ওই অতি ক্ষুদ্র বস্তুটির মধ্যে, বইয়ে ঠাসা একটি বড়সড় লাইব্রেরির চেয়েও
বেশি তথ্য থাকে। সেই ডিএনএর মধ্যে আবার থাকে জিন। তারাই হল কারিগর। ডিএনএ’র নির্দেশিকা
অনুযায়ী তারা তৈরি করে শরীরের নানান ধরনের
প্রোটিন। আমাদের হাড়গোড়, চামড়া, রক্ত, চুল, নখ, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, মস্তিষ্ক ও অন্যান্য
সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি হয় প্রোটিন দিয়ে। ডিএনএ’র যে নির্দেশিকা প্রোটিন তৈরির কাজে
আসে, সেগুলিকেই এত দিন গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন বিজ্ঞানীরা। ডিএনএর মাত্র দুই শতাংশ প্রোটিন
তৈরির কাজে আসে। ডিএনএ’র বাকি অংশ কোনও কাজে আসে না, এই মনে করে, সেগুলিকে ‘জাঙ্ক ডিএনএ’
বা জঞ্জাল ডিএনএ আখ্যা দেওয়া হয়। লুল্ড ইউনিভারসিটির গবেষকরা দেখেন, ওই জঞ্জালেই লুকিয়ে
আছে মানুষ আর শিম্পাঞ্জির বিভেদের রহস্যের উত্তর। ওই উপেক্ষিত ৯৮ শতাংশের মধ্যে, মস্তিষ্ক
গঠনের ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের কাজ চলে। সেখানে যা লেখা আছে, শিম্পাঞ্জির মগজকে তা দেয়
এক ধরনের ক্ষমতা, আর মানুষের মগজকে অন্য ধরনের।
এই গবেষণা পত্র পকাশিত হয়েছে ‘সেল স্টেম সেল’ জার্নালে।
ছবি: https://www.flickr.com/photos/adrants/2514256784
Comments
Post a Comment