দুই ‘শিশু’ নিনো আর নিনা’র খেলা
এল
নিনোর বোন লা নিনা। এদের নাম দু’টি স্প্যানিশ। এল নিনো মানে ছোট্ট ছেলে। আর, লা নিনা হল ছোট্ট মেয়ে। অন্যান্য ভাষায় ওদের অন্য নামও আছে হয়তো। কিন্তু আমরা তাদের নিনো আর নিনা নামেই চিনি।
ছোট হলে কি হবে, তাদের দাপট খুব। তারা দু’জনে পৃথিবীর আবহাওয়ার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। এল
নিনো যখন দাপিয়ে বেড়ায়, তখন খুব গরম পড়ে। হাঁসফাঁস করে মানুষ। আর অবলা প্রাণীরা কিছু বলতে পারে না, কিন্তু তাদেরও খুব কষ্ট হয়। আর লা নিনা যখন খেলা করে, তখন পৃথিবীর নানা দিকে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা পড়ে।
সে শীত মোটেই খুব সুখের হয় না।
এল
নিনো আর লা নিনার খেলার জায়গা প্রশান্ত মহাসাগর। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে হয়, প্রশান্ত মহাসাগরের সেই জায়গা যেটি ক্রান্তীয় বলয়ের মধ্যে পড়ে। কয়েক বছর অন্তর প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় বলয়ের জলের তাপমাত্রা একটু গরম হয়ে ওঠে। কিন্তু কখন তা ঘটবে তার কোনও স্থিরতা নেই। হঠাৎই দেখা দেয় কোনও কোনও বছর। শুরুটা হয় দক্ষিণ আমেরিকায়। পেরুর উপকুলে। সেখানকার মৎসজীবীরা বুঝতে পারেন, সমুদ্রের জল গরম হচ্ছে। জল গরম হওয়ার সঙ্গে, তার প্রভাব পড়তে শুরু করে আবহাওয়ায়। সমুদ্রের উষ্ণ জল বয়ে চলে পশ্চিম দিকে। আর সেই সরে যাওয়া উষ্ণ জলের জায়গা পুরণ করে নীচে থেকে উঠে আসা ঠান্ডা জল। উষ্ণ জল যত পশ্চিমে প্রবাহিত হতে থাকে, ততই সমুদ্র পৃষ্ঠের ওপরের বাতাস গরম হয়ে ওঠে। তার প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বের আবহাওয়ায়। কোথাও তাপমাত্রার পারদ চড়তে থাকে ধাপে ধাপে। কোথাও মৌসুমি বায়ু উধাও হয়ে যায়। ফলে, বৃষ্টিপাতের বদলে সেখানে অগ্নিবর্ষণ হতে থাকে আকাশ থেকে। তাপপ্রবাহ আর খরা দেখা দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে দাবানল। তারপর এক সময় থেমে যায় এল নিনোর খেলা। ঠান্ডা হতে থাকে প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় বলয়ের জল।
আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে পৃথিবীর আবহাওয়া।
যখন লা নিনার আবির্ভাব হয়, তখন তার প্রভাবটা হয় ঠিক উল্টো। গরমের বদলে, পৃথিবীর নানান দিকে জমিয়ে ঠান্ডা পড়ে।
পূর্ব দিকে বইতে থাকে হাওয়া, আর সেই দিকে প্রবাহিত হতে থাকে ঠান্ডা জল। তার ফলে, এল নিনার জন্ম হয়। দক্ষিণ আমেরিকায়, ক্রান্তীয় প্রশান্তু মহাসাগরের জল, স্বাভাবিকের চেয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়। আর তার প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বে। পৃথিবীতে হাওয়া চলাচল আর সমুদ্রের জলের স্রোত বিশ্বের নানা দিকে উষ্ণতা ছড়িয়ে আবহাওয়াকে সহনশীল রাখে। কিন্ত প্রশান্ত মহসাগরের জল আর সেই সঙ্গে তার ওপরের বাতাস যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়, তার প্রভাব
অনুভুত হয়
বিশ্বজুড়ে। জমিয়ে ঠান্ডা পড়ে দেশে দেশে।
লা
নিনার ঠেলায়, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের ওপরের বায়ুমন্ডলে সৃষ্টি হয় নিম্নচাপ। তার ফলে প্রবল বর্ষণ হয় দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, ভারত ও বাংলাদেশ জুড়ে। ২০২১-এর বর্ষায় যে প্রবল বর্ষণ হয়েছে ভারতের কিছু অঞ্চলে, তার পেছনে লা নিনার হাত আছে বলে মনে করা হচ্ছে। লা নিনাই আবার পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের বায়ুমন্ডলে সৃষ্টি করে অতি চাপ।
তার ফলে, গরের উপকুলে অবস্থিত দক্ষিণ আর উত্তর আমেরিকার অঞ্চলগুলিতে মেঘ সৃষ্টি হয় না। বৃষ্টিও হয় না সেখানে।
এল
নিনো সাধারণত বছরখানেক স্থায়ী হয়। লা নিনা কিন্তু এক থেকে তিন বছর চলতে পারে। প্রকৃতির এই দুই বৈশিষ্ট দেখিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর পরিবেশ একই সূত্রে বাঁধা। প্রথিবীর এক প্রান্তে কিছু ঘটলে, তার প্রভাব অনুভুত হয় অপর প্রান্তে।
লা
নিনার প্রভাবে ভারতে এ বছর অতিবৃষ্টিতো হয়েইছে, সেই সঙ্গে অগ্রিম তুষারপাতও শুরু হয়ে গেছে। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখে অক্টোবরের শুরুতেই তুষারপাত ঘটেছে।
হিমাচল ও উত্তরাখন্ডের উঁচু এলাকায়ও অনেক আগেই বরফ পড়েছে। এমন নয় যে অক্টোবরে কখনওই বরফ পড়ে না এ সব জায়গায়। কিন্তু এবার তুষারপাতের পরিমাণ অনেক বেশি।
ভাবতে অবাক লাগে যে, সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার কাছে প্রশান্ত মহাসাগরের জল ঠান্ডা হওয়ার ফলে মার খাচ্ছেন কাশ্মীরের আপেল চাষিরা। এই নিয়ে পরপর দু’বছর, লা নিনার প্রভাবে, অসময়ে তুষারপাত নষ্ট করেছে কাশ্মীরের আপেলের ফসল।
কিন্তু লা নিনার ওপর সব দোষ চাপানো অন্যায় হবে। আসলে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন। উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের জলের গড় তাপমাত্রা একটু বেড়েছে।
মেডিটেরেনিয়ান সাগরের জলও এখন একটু উষ্ণ। প্রকৃতিতে একটু মানে অনেক। মেডিটেরেনিয়ান সাগর থেকে যে বাতাস স্বাভাবিক ভাবে আফগানিস্তানের ওপর দিয়ে ভারতের দিকে আসে, উষ্ণায়নের কারণে তাতে এখন বষ্পের পরিমাণ কিছু বেশি। এদিকে, লা নিনার দৌলতে, আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্বতমালার পরিবেশ এখন একটু বেশী ঠান্ডা। ফলে, মেডিটেরেনিয়ান সাগর থেকে ধেয়ে আসা সেই বাষ্পভারী বাতাস, আফগানিস্তানে হিন্দুকুশ পর্বতমালার শীতল হাওয়ার সঙ্গে মিশে সৃষ্টি করছে অকাল তুষারপাত। তাতে
অসুবিধের মধ্যে পড়ছেন কাশ্মীর আর হিমাচল প্রদেশের আপিল চাষিরা।
ছবি: কাশ্মীরের গুলমার্গ
Comments
Post a Comment