নীল রং সব গেল কোথায়
প্রকৃতির
দিকে এক বার ভালো করে তাকিয়ে দেখুন তো। গাছপালা, পশু-পাখি, মাটি,
পাথর, পাহাড়, বয়ে-চলা
নদী - সবের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে যান। খেয়াল করে দেখবেন যে, নীল
রঙটা খুব বেশি চোখে পড়ছে না। আকাশ আর সমুদ্র বাদ দিলে, প্রকৃতিতে
নীলের ব্যবহার তেমন নেই বললেই চলে। তাহলে কি ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, নীল রঙ প্রকৃতির পছন্দ নয়?
আমরা যে
রঙ দেখি, সেগুলি আসলে প্রতিফলিত
আলোর বর্ণ। তার মানে, কোনও কিছুর ওপর আলো পড়লে, তার থেকে কিছুটা প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে পৌঁছয়। তার ফলে, আমরা সেই আলোর বর্ণগুলি দেখতে পাই।
ধরা যাক, আপনার কালো জামাটার কথা। সেটা কালো কেননা,
সেটা থেকে কোনও আলোক রশ্মি আমাদের চোখে এসে পৌঁছয় না। আলোর সাতটা
রঙই শুষে নেয় আপনার জামা। তাই সেটিকে কালো দেখায়। কিম্বা আসা
যাক কৃষ্ণকলির কথায় - সেই কালো মেয়ে, যার কালো হরিণ চোখ
মুগ্ধ করেছিল রবীন্দ্রনাথকে। শ্যামবর্ণ কৃষ্ণকলির গায়ের ত্বক এমনই যে তা শুষে নেয় আলোর বেশিরভাগ বর্ণ। তাই ছোট-বড় তরঙ্গ তুলে সেগুলি আপনার চোখে পৌঁছনর
কোনও সুযোগই পায় না। কবিগুরুর চোখেও পৌঁছয়নি।
তাইতো কৃষ্ণকলি কালো। সেই কারণেই তো আঁধারও কালো। সূর্য ডুবে গেলে, প্রায় আলোহীন পৃথিবীতে আমাদের চোখ ভালো করে কিছুই দেখতে পায় না। যেখানে
আলোর উৎসই নেই, সেখানে কোনও আলোক রশ্মি আমাদের চোখে এসে পৌঁছয় না।
অর্থাৎ, প্রকৃতির বিভিন্ন সদস্যরা
আলোর বর্ণালীর কোন বর্ণটা শুষে নিচ্ছে আর কোনটা বাদ দিচ্ছে,
তার ওপরই নির্ভর করে আমরা কোন রঙ দেখছি আর কোনটা দেখছি না।
যেমন, গাছপালার রঙ সবুজ। সজীব,
সতেজ সবুজ দেখতে কার না ভালো লাগে! কিন্তু আশ্চর্যের
কথা হলো এই যে, সবুজ রঙটা গাছেরা গায়ে
মাখে না। আলোর অন্য বর্ণগুলিকে শুষে নিলেও, সবুজ রঙ প্রত্যাখ্যান করে তারা।
তাই, পাতা থেকে প্রতিফলিত হয়ে ওই রঙটি আমাদের চোখে
ধরে বলে, পাতাকে দেখায় সবুজ।
বিজ্ঞান বিষয়ক
লেখক কাই কুপফেরশ্মিড এ নিয়ে একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম, ‘ব্লু: ইন সার্চ অফ
নেচার্স রেয়ারেস্ট কালার’ ( প্রকৃতির বিরল রঙ নীলের
সন্ধানে)। উনি বলেছেন, আমরা যখন একটি নীল ফুল দেখি, তখন বুঝতে হবে যে ফুলটি আর সব রঙ গ্রহণ করে, নীলটিকে
রেখে দিয়েছে আমাদের, প্রজাপতির বা মৌমাছিদের
- চোখের সুখের জন্য। কারণ, ওই রঙ দেখে আকৃষ্ট হবে তারা।
ঘটাবে পরাগ মিলন। আর সেই সুবাদে বংশ বৃদ্ধি করে লাভবান হবে গাছটি। কুপফেরশ্মিড
হিসেব করে দেখেছেন, পৃথিবীতে প্রায় তিন লক্ষ প্রজাতির গাছে
ফুল ফোটে। তার মধ্যে ১০ শতাংশেরও কম প্রজাতির অঙ্গে নীল ফুল শোভা পায়।
পশু
পাখিদের বেলায়ও একই কারণে আমারা তাদের মধ্যে নীলের ছোঁয়া দেখতে পাই কি পাই না।
মাছরাঙা পাখির ডানায় নীল পালক উঁকি মারে। অনেক প্রজাপতি নীল ডানা মেলে বসে হলুদ
ফুলের ওপর। আলোক রশ্মি তেমন ভাবে পড়লে ধূসর পায়রার গলায়ও দেখা দেয় নীল আভা।
ইঁট কাঠ
পাথরের ক্ষেত্রেও অন্যথা হয় না। যার মলিকিউলের যেমন বৈশিষ্ট, তার ওপরই নির্ভর করে হিরে,
চুনি পান্নার রঙ। আপাতদৃষ্টিতে পায়ের তলার
মাটি আর পাহাড়ের প্রস্তরখণ্ড নিষ্প্রাণ জড় পদার্থ হলেও, দিনে
রাতে তাদের মধ্যেও চলতে থাকে আলো দেওয়া-নেওয়ার খেলা। তাদের মধ্যে জমে থাকা মলিকিউলের সারি সূর্যের
আলো পড়লেই তার বিভিন্ন রশ্মিগুলিকে নানা মাত্রায় শুষে নিতে
থাকে। ফলে, আলোর
মধ্যে যে এনার্জি বা শক্তি আছে, তা সেই বস্তুর মলিকিউলগুলি
টেনে নিতে থাকে। আর এনার্জি সঞ্চয় করতে করতে, গরম হয়ে ওঠে
ক্রমশ। প্রশ্ন হল, কোনটা নিচ্ছে আর কোনটা ফেলছে? নীল পাথর, নীল মাটি, নীল
বালুচর সচরাচর দেখা যায় না। অথচ সূর্যালোকের নীল রশ্মি সব
চেয়ে এনার্জি সমৃদ্ধ। আর হয়ত সেই করণেই, পৃথিবীর প্রাণীকুল ও জড় জগৎ সবচেয় দ্রুত, সব চেয়ে বেশি পরিমাণ এনার্জি পাওয়ার তাগিদে সূর্যের আলোর নীল রশ্মিকেই সব চেয়ে বেশি পরিমাণে টেনে নেয়। তাই প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে প্রবেশ করার মতো ওই রশ্মির খুব
কমই অবশিষ্ট থাকে। ফলে, আমাদের চারপাশের জগতে নীলের দেখা পাওয়া যায় না তেমন।
Comments
Post a Comment