উষ্ণায়ন: এবার লাল আলো জ্বাললেন বিজ্ঞানীরা

 



এবার সরাসরি লাল সংকেত দেখালেন বিজ্ঞানীরা। সমুদ্রে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণীঝড় সৃষ্টি হলে, লাল সঙ্কেত জারি করে বিপদ সম্পর্কে সাবধান করা হয় সকলকে। তেমনই পৃথিবীজুড়ে যে এক প্রবল বিপর্যয় ঘনিভুত হচ্ছে, সে সম্পর্কে বিশ্ববাসিকে সাবধান করতে এবার বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন লাল অলো। 

মানুষের কর্মকান্ডের ফলে, পৃথিবীর আবহাওয়া ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে। গ্রিনহাউস গ্যাস ক্রমাগত জমছে বায়ুমন্ডলে। বাতাসে কর্বনের পরিমান বিপদসীমার কাছে পৌঁছে গেছে। বনভূমি ধ্বংস আর জলাভূমির বিলোপ, পরিবেশকে করে তুলছে শুষ্ক, রুক্ষ। এ সবের ফলে, পরিবেশ গরম হয়ে উঠছে।  আজ থেকে ২৫০ বছর আগে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যা ছিল, আগামী দিনে সেই তাপমাত্রা যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায়, তাহলে হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণীর পক্ষে তো বটেই, এমনকি কোটি কোটি মানুষের পক্ষেও খেয়ে-পরে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। অনেক দিন ধরে এই কথা বলে আসছেন বিজ্ঞনীরা। কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রা যাঁরা নিয়ন্ত্রন করেন, বিজ্ঞনীদের কথাগুলো তাঁদের কানে গেলেও, মগজ অবধি পৌঁছচ্ছিল না। গত মাসে, বিশ্বের বিজ্ঞানীরা যে রিপোর্ট রাষ্ট্রপুঞ্জের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাতে তাঁরা খুব জোর দিয়ে বলে দিয়েছেন যে, এক ভয়ঙ্কর দিন আসছেই। সমস্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা জানিয়েছেন যে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। কমার কোনও লক্ষণ নেই। আর দু দশক বা ২০ বছরের মধ্যেই, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সেই বিপদ সীমা অতিক্রম করবে পৃথিবীর আবহাওয়া। তারপর প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে, শুরু হবে এক বিরামহীন প্রলয়ের যুগ। তাই তাঁরা লাল অলো দেখিয়েছেন। অর্থাৎ মানুষের প্রকৃতি-ধ্বংসকারী আধুনিক সভ্যতার বুলেট ট্রেনের চাকায় এখনই ব্রেক কশতে হবে। কারণ, লাল সঙ্কেত উপেক্ষা করার মানেই তো বিনাশ।

ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আপিসিসি) বা জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর নজর রেখে চলেছেন যে বিজ্ঞানীরা, তারা কয়েকটি বিপদ সঙ্কেতের দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্শন করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন:

·         ২০১১-২০২০, এই দশ বছরে পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ১৮৫০-১৯০০-এর তুলনায় ১.০৯ ডিগ্রি সেলসিয়ার বেড়েছে।

·         ১৮৫০ পর থেকে  যে ১৭১ বছর আমরা পার করে এসেছি, তার মধ্যে বিগত পাঁচ বছর ছিল সবচেয়ে গরম।

·         ১৯০১-১৯৭১ পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠ যে হারে উঁচু হয়, সাম্প্রতিক কালে সেই বৃদ্ধি তিনগুন হয়েছে।

·         পৃথিবীর পর্বতমালায় যে হিমবাহগুলি আছে, সেগুলি ছোট হয়ে যাচ্ছে আর প্রবল হারে গলছে মেরু অঞ্চলের বরফ। বিজ্ঞানীরা বলেছেন এর জন্য ৯০ শতাংশ দায়ী মানুষের কার্যকলাপ।

·         তাছাড়া প্রায় নিশ্চিতভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে যে ১৯৫০-এর পর থেকে গরম বাড়ছে। ঘন ঘন তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হচ্ছে। সেই তুলনায় শীত ও শৈত্যপ্রবাহ কমছে।

ব্রিটেনের রিডিং ইউনিভারসিটির প্রফেসর এড হকিন্স ওই রিপোর্ট যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে একজন। উনি বলেছেন, ইতিমধ্যেই যে উষ্ণায়ন ঘটে গেছে, তার প্রভাবকে আর আটকান যাবে না। আগামী একশ, হাজার বছর ধরে প্রকৃতির ওপর তার প্রভাব পড়তে থাকবে। সমুদ্রগুলি আরও গরম হবে। সেগুলির জলে অ্যাসিডের মাত্রা বাড়বে। মেরু বরফ কমতেই থাকবে। পাহাড়ের হিমবাহগুলির সঙ্কোচন ঠেকান যাবে না। আর মানুষের কিত্তিকলাপের জন্য গরম যত বাড়বে, পরিস্থিতি ততোই ঘোরাল হয়ে উঠবে।

আগামী দিন যে মোটেই সুখের হবে না,  প্রকৃতি বার বার তা জানিয়ে দিয়েছে বিগত দু-তিন বছরে। গ্রীশ্মের দাবদাহে হাসফাস করেছে ঠান্ডা দেশের মানুষ। এমনকি হিমশীতল সাইরেরিয়াতেও নাকি এখন পড়ছে কলকাতার মত গরম। ভয়াল দাবানলে পুড়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, স্পেন, ইতালি, গ্রিস,  তুরস্ক,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের বিস্তির্ণ বনভূমি। সেই আগুনে জীবন্তু পুড়ে মরেছে কয়েকশ কোটি প্রাণী। দাবানল আগেও হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর এত দেশে, এত ঘন ঘন, দাবানলের এমন ভয়ঙ্কর রূপ, আগে কেউ দেখেছেন বলে তো জানা যায়নি।

অন্যদিকে, বন্যায় ভেসেছে জার্মানি আর বেলজিয়ামের মত উন্নত দেশ। সেখানে এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ। কয়েকশ মানুষ মারা গেছেন বন্যাকবলিত চিনে। আরব সাগর ও ভারত মহাসগর থেকে ধেয়ে আসা সুপারসাইক্লোন বার বার আছড়ে পড়ছে ভারত ও বাংলাদেশে। তার ফলে, ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বিপুল। একটা সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার এক জীবনসঙ্কটে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। আর হিমালয়ে হঠাৎ মেঘভাঙ্গা বৃষ্টি, নদীতে বার বার হড়পা বান, দেশলাই বাক্সের মত ভেসে যাওয়া ঘরবাড়ি ও গোটা একটা পহাড় ধ্বসে যাওয়ার যে দৃশ্য দেখা গেছে ইদানিং, তেমনটা দেবভূমিতে কবারই বা দেখা গেছে অতীতে? 

লাল সঙ্কেত এখন জ্বলজ্বল করছে আমদের সামনে। তাই এবার কি থামব আমরা? ধ্বংসের হাইওয়ে ছেড়ে, প্রকৃতির কোল ঘেঁষে যে পথ গেছে নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে, সেই পখ কি এবার ধরব আমরা?  

 

 

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ভালো হরমোন বাড়ায় কুকুর, বেড়াল

গাছেরা কি দেখতে পায়

অন্ধকারকে মানুষ ভয় পায় কেন