বৃহৎ এক ঘাতক তাপপ্রবাহ
মালবী গুপ্ত
প্রাণঘাতী কোভিড ১৯’র পর কি তাপপ্রবাহই পরবর্তী বৃহৎ ঘাতক হিসেবে হাজির হবে পৃথিবীতে? বিজ্ঞানীদের মনে এমন একটা আশঙ্কা দানা বাঁধছে বটে। কারণ জলবায়ু পরির্বতনের ধাক্কায় বিশ্বের নানা প্রান্তে যে হারে তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে এমন একটা সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠছে। কারণ জুনের শেষে পশ্চিম কানাডা ও আমেরিকার উত্তর পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যে তাপপ্রবাহ ঘটেছে, তাতে ইতিমধ্যেই অন্তত পাঁচশ’র বেশি মানুষের প্রাণ গেছে।
বিবিসি.কম’র একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, বিশ্বের তাপমাত্রা যে হারে বৃদ্ধি পাবে ভাবা হয়েছিল, দেখা যাচ্ছে তার থেকে অনেক দ্রুত ও বেশি মাত্রায় তা পৃথিবীকে উষ্ণ করে চলেছে। এবং তা ঘটছে লাগাম ছাড়া ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর জন্যই। জানা যাচ্ছে তাপ বৃদ্ধির পূর্ববর্তী সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে এবার। কানাডায় আগেকার সর্র্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ছিল ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই জুনে সেখানকার ব্রিটিশ কলোম্বিায় গ্রাম লিটোন’এ তা ৪৯.৬ ডিগ্রি ছুঁয়েছে। অবশ্য ঠিক তার আগেই ওই গ্রামটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল ওয়াইল্ড ফায়ার বা দাবানলে ধ্বংস হয়েছে। তবে আমেরিকার ওরেগাঁও, ওয়াশিংটন ও কানাডার পশ্চিম অঞ্চলের বহু শহরেরই তাপমাত্র এবার ৪০ ডিগ্রির বেশি ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড করেছে।
স্বভাবত শীতপ্রধান এই দেশগুলি এখন গরমে ফুটছে। এবং ওই প্রচন্ড দাবদাহে অনভ্যস্ত সাধারণ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন ও প্রাণ হারাচ্ছেন। গবেষকরা বলছেনই যে, মানুষের নানা কাজকর্মের ফলই এই উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ। ২৭ জন আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষকের একটি দল সাম্প্রতিক ওই তাপমাত্রা বৃদ্ধির সব তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা দেখার চেষ্টা করছেন, জলবায়ু পরিবর্তন সিয়াটেল, পোর্টল্যান্ড ও ভ্যাঙ্কুভার’র ওই প্রবল গরমকে কতটা প্রভাবিত করেছে। তাঁরা বলছেন, বায়ুমন্ডলে বাড়তি গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়া এমন চরম আবহাওয়া হত না।
গবেষকরা আরও আশঙ্কা করছেন যে, এমন ঘটনা পৃথিবীর নানা প্রান্তেই আরও ঘটবে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহে শুধু মানুষ নয়, কানাডার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকুল জুড়ে প্রায় ১০০ কোটি সামুদ্রিক প্রাণীরও মৃত্যু ঘটেছে। ভ্যাঙ্কুভারে সমুদ্রতীর ধরে হাঁটলে দেখা যাচ্ছে লক্ষ মরা শামুক ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। প্রচন্ড তাপে ঝলসানো সেই শামুকের গন্ধে সেখানকার বাতাস ভারি হয়ে আছে। দ্যগার্ডিয়ান.কম’এর একটি প্রতিবেদন বলছে, ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র-জীববিজ্ঞানী খ্রিস্টোফার হারলে ও তাঁর এক ছাত্র ওই সময়ে ভ্যাঙ্কুভারের পাথুরে উপকুলের তাপমাত্রা মেপেছিলেন ৫০ ডিগ্রি।
হারলের মতে, ঝিনুক জাতীয় সেলফিশ কয়েক ঘন্টা মাত্র ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বেঁচে থাকতে পারে। আর সেখানে কয়েক দিন ধরে চলছিল ওই উচ্চমাত্রার তাপপ্রবাহ। ফলে অনুমান করা যায় ঝিনুক সহ অন্যান্য জলজ প্রজাতিদের জীবনেও কী ঘটেছে। তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকেও অসংখ্য মৃত রক ফিশ, ঝিনুক ইত্যাদি সামুদ্রিক প্রাণীদের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন হারলে।
গবেষকরা এই বলে সবাইকে সাবধান করছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই ধরনের তাপপ্রবাহ এখন মাঝে মাঝে আসবে। যার পরিণতিও এমনই বা আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো আসন্ন তাপ্রবাহের আগাম খবর পেলে মানুষ হয়তো নিজেকে বাঁচাতে ঠান্ডা জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নেবে। কিন্তু সামুদ্রিক প্রাণীদের পক্ষে তেমন আশ্রয় পাওয়া কঠিন। তাদের মৃত্যু তাই অনিবার্য হয়ে উঠবে। যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্রে চরম আঘাত হানবে এবং নষ্ট হবে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও। এমনটাই আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এবং বলা বাহুল্য যার ফল কিন্তু শেষ বিচারে ভুগতে হবে সেই মানুষকেই।

Comments
Post a Comment