বিপদ সীমায় পৌঁছচ্ছে কারবন ডাইঅক্সাইড

 



প্রতি বছর বছর একটা সময় উত্তর মেরুতে বরফ কমে যায় গ্রীষ্মকালে বরফ গলা শুরু হয় সেপ্টেম্বর মাসে বরফের পারিমাণ সব চেয়ে কম থাকে তারপর আবার শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে বরফ জমতে থাকে সেখানে বরফ গলা আর জমার ছবিটা ধরা পড়ে উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবিতে গত বছর উত্তর মেরুতে বরফ এতটাই কমে গিয়েছিল যে বলা হচ্ছে, ৪২ বছরে কেবল একবারই এমনটা হয়েছিল

তাছাড়া উত্তর মেরুর বায়ুমন্ডলে যে পরিমাণ কারবন-ডাইঅক্সাইড জমেছে, তা মানব ইতিহাসে আগে কখনও হয়নিইন্টার গভর্ণমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ জানিয়েছে যে, আজ সেখানে কারবন ডাইঅক্সাইডের পরিমান ৪২০ পিপিএম সেখানকার বাতাসে এই পরিমাণ কারবন ডাইঅক্সাইড গ্যাস আগে একবার জমে ছিল বটে তাবে তা হয়েছিল ৩০ লক্ষ বছর আগে প্লায়েওসিন যুগে

দ্য কনভারসেশন- প্রকাশিত এক লেখায় দুই ভূবিজ্ঞনী লিখেছেন যে, উত্তর মেরুর বায়ুমন্ডলে এই পরিবর্তন সারা প্রথিবীর পরিবেশকে বদলে দেবে সমুদ্রে জল বাড়বে আবহাওয়ার গতিবিধি পাল্টাবে আর সেই সঙ্গে প্রকৃতি মানুষের সমাজ দুইই রীতিমত বদলে যাবে আগামী পৃথিবী হবে একটা সম্পূর্ণ অচেনা জগৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভারসিটি অফ ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট-এর দুই ভূবিজ্ঞনী, জুলি গ্রেট্টে স্টিভ পটশ, কথা লিখেছেন

বায়ুমন্ডলে কারবন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ যে হারে বাড়ছে, তার ফলে পৃথিবীর পরিবেশ যেন সেই প্লায়োসিন যুগের মতই হয়ে দাঁড়াবে আজ আর্কটিক অঞ্চলে কোনও গাছ নেই কোথাও কোথাও ঘাস গজায় বা ছোট ছোট গাছ চোখে পড়ে মাত্র কিন্তু ওই দুই ভূবিজ্ঞানী রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে মাটির নীচে ফুলের রেণু পেয়েছেন তাঁরা বলেছেন যে, সেই ৩০ লক্ষ বছর আগে, আর্কটিক ছিল সবুজ সেখানে ছিল বিরাট বিরাট পাইন, স্প্রুস আর লার্চ গাছের জঙ্গল

 সেই প্লায়েওসিন যুগে, উত্তর মেরু আজকের তুলনায় অনেক বেশি গরম ছিল তাই গ্রিনল্যান্ডে আজ যে পুরু বরফের চাদর আছে, তার কোনও অস্তিত্বই ছিল না সে কালে কেবল, কোথাও কোথাও, পাহাড়ের গয়ে ছোট ছোট হিমবাহ ছিল বরফ যদি কোথাও থেকে থাকে, তা ছিল দক্ষিন মেরুতে

সে যুগে সমুদ্রের জল ছিল বেশ উষ্ণ আর উত্তর গোলার্ধে কোনও বরফ ছিল না বললেই চলে তাই আজকের তুলনায় সে কালের সমুদ্রপৃষ্ঠ ছিল ৩০ থেকে ৫০ ফিট আরও উঁচু ফলে, আজকের উপকূল, যেখানে হয়ত আছে ঘন বসতি,  সেই সব জায়গা ছিল জলের তলায় আজকে যদি আর্কটিকের বাতাসে কারবন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা সেই প্লেয়োসিন যুগের মাত্রায় পৌঁছে গিয়ে থাকে, তাহলে তো প্লেয়োসিন যুগের সেই পরিবেশ আবার ফিরে আসবে পৃথিবী যে সে দিকেই এগোচ্ছে, তার ভুরি ভুরি প্রমাণ তো উত্তর মেরু থেকে ইতিমধ্যেই আসতে শুরু করেছে  আগামী পৃথিবীর দিকে যাঁরা নজর রাখছেন, তারা তো দেখতে পাচ্ছেন এক বরফহীন উত্তর মেরু এক সত্যিই সবুজ গ্রিনল্যান্ড সাইবেরিয়ার পারমাফ্রস্ট গলে গিয়ে সেখানে ঘন বনভূমির বিস্তার বছর বছর উঁচু হতে থাকা সমুদ্র পৃষ্ঠ উপকূল ব্যাপী ডুবন্ত জনপদ বিপথগামী মৌসুমী বায়ু বৃষ্টির দেশ ছেড়ে, সাহারায় মেঘের ঘনঘটাআবার মেঘভাঙা বর্ষণে দেশে ভয়াল বন্যা। ঠান্ডার দেশে থেকে থেকে কালাহারির গরম।

আজ থেকে কোটি বছর আগে, ডাইনসরেরা যে সময় বিলুপ্ত হল পৃথিবী থেকে, সেই সময় বাতাসে কারবন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ ছিল ,০০০ পিপিএম ভূবিজ্ঞানীরা লিখেছেন, কারবন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ কমানর নিজস্ব উপায় আছে পৃথিবীর পাথরের সঙ্গে কারবন ডাইঅক্সাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে তার ফলে, এক দিকে পাথর ভেঙ্গে চুরচুর হয়ে রাসায়নিক পদার্থ হয়ে মাটিতে মিশে যায় আর অন্য দিকে, বাতাসে কারবন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ কমতে থাকে কিন্ত কাজটা এক বছরে হয়না দশ হাজার বছরেও নয় লেগে যায় লক্ষ লক্ষ বছর

যেমন, ডাইনসরের যুগের বাতাসে যে ২০০০ পিপিএম কারবন ডাইঅক্সাইড ছিল, তা প্লায়োসিন যুগের ৪০০ পিপিএম- নামতে লাগে প্রায় কোটি বছর তারপর, প্লায়োসিনের ৪০০ পিপিএম থেকে ১৭৫০ সালের ২৮০ পিপিএম- নামতে লাগে আরও ৩০ লক্ষ বছর  ১৭৫০-এই শুরু হয় যন্ত্র সভ্যতার যুগ আর সেই থেকে, সভ্য মানুষ বাতাসে কারবন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা হাসতে হাসতে আবার পৌঁছে দিয়েছে সেই প্লায়োসিন যুগের স্তরে তার জন্য তার সময় লেগেছে মাত্র ২৭০ বছর

সত্যি, কী না পারে আধুনিক মানুষ এত দ্রু নিজের কবর খুঁড়তে আর তো কেউ পারে না!

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

প্রকৃতি তৈরি করছে প্লাস্টিকের পাথর

গাছেরা কি দেখতে পায়