মানুষও কি একদিন বিষধর হবে

 


দুর্মুখ মানুষ সম্পর্কে বলা হয়, তাদের মুখ দিয়ে যেন বিষ ঝরে। তাঁদের ভাষার ঝাঁজ বোঝাতেই, এমনটা বলা হয়।  তবে মানুষের মুখ থেকে বিষ ঝরার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা – বা বিষধর মানুষের আবির্ভাব – বোধহয় একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্তত, কল্পবিজ্ঞানের জগতে তেমনটা হওয়া তো একেবারেই অকল্পনীয় নয়।

বিষ অনেক প্রাণীরই আছে। সাপের কথাটা প্রথমেই মনে এলেও, জলে স্থলে বহু প্রাণী, বিষকে শিকার ও আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। প্রাণী বিশেষে বিষের বৈশিষ্ট্য ও তীব্রতায় তারতম্য ঘটে।  কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বিষ তৈরির কাজ যে জিনের সক্রিয়তায় হয়, সেই জিন আছে সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ীদের শরীরে। ‘রয়াল সোসায়েটি পাবলিশিং’-এ প্রকাশিত জাপানের ওকিনাওয়া ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-র গবেষক অগ্নীশ বড়ুয়া ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভারসিটির আলেকজান্ডার মিখেয়েভ-এর গবেষণাপত্র থেকে জানা গেছে এ কথা।

ভেনম বা বিষ অনেক প্রাণীর মধ্যে পাওয়া যায় - যেমন, জেলিফিস, মাকড়সা, বিছে, সাপ ও স্লো লোরিসের মতে স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে।  এবং যদিও বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে তারা বিষ ছড়ানোর আলাদা আলাদা উপায় আয়ত্ত করেছে, তবুও বিষ সাধারণত থাকে তাদের মুখে।  আর কামড়ের মধ্যে দিয়েই তা অন্যের শরীরে প্রবেশ করানো হয়, বলেছেন গবেষক বড়ুয়া।

দেখা গেছে, প্রাণীদের মুখের মধ্যে স্যালাইভা বা লালা তৈরি করে যে গ্ল্যান্ড বা গ্রন্থি, তাদের ক্রিয়াকলাপ সাপের বিষ তৈরি করার গ্রন্হির কাজের ধারার সঙ্গে মেলে। প্রাসঙ্গিক জিনের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, লক্ষ লক্ষ বছর আগে, কোনও এক সময়, ওই স্যালাইভা বা লালা তৈরির গ্রন্থি ভাগ হয়ে গিয়ে ছিল।  তার মধ্যে নতুন যে ধারাটির আবির্ভাব হয়, সেটি বিষ তৈরি কাজে লেগে পড়ে। অর্থাৎ, ব্যাপারটা দাঁড়ায় এই রকম - লালা তৈরির যে ছোট কারখানা প্রাণীদের শরীরে ছিল, সেখানে বিবর্তন-প্রিয় প্রকৃতি, নানা দিক বিবেচনা করে, বিষ তৈরির একটা নতুন ওয়ার্কশপ খুলে বসে।

সেই থেকে নানা রকমের বিষ তৈরির কাজে অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে উঠেছে সাপেরা।  তাদের কারও বিষ এতটাই ভয়ঙ্কর যে, তারা কামড়ালে, এক ছোবলেই শেষ।  যেমন, শঙখচূড় বা কিং কোবরা।  হাতিরাও তাদের এড়িয়ে চলে।  আবার কালাচ নামে এমন এক বিষাক্ত সাপ আছে, যাদের কামড় অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না।  কিন্তু দু’দিন পরে শরীরে এমন বিষক্রিয়া দেখা দেয় যে, আক্রন্তকে বাঁচানই দুষ্কর হয়ে দাড়াঁয়।  এও দেখা গেছে যে,  শ্রু নামে ছুঁচলোমুখো ইঁদুরের মত এক প্রাণী আছে।  তাদের লালাতে মেশানো থাকে হাল্কা বিষ।  পোকামাকড় খেয়ে বাঁচে প্রাণীটি। 

অগ্নীশ বড়ুয়া বলেছেন, ১৯৮০’র দশকে পরীক্ষা করে দেখা গিয়ে ছিল যে, পুরুষ ‘মাইস’ বা ছোট প্রজাতির ইঁদুরের লালাতে এমন এক ধরনের বিষাক্ত যৌগ তৈরি হয় যা ‘র‌্যাট’ বা একটু বড় প্রজাতির ইঁদুরের শরীরে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করালে, তা র‌্যাটের মধ্যে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে।  ফলে, প্রকৃতির খেয়ালে যদি ওই মাইসদের বংশবৃদ্ধির হার খুব বেড়ে যায় আর তাদের লালাতে বিষাক্ত যৌগের পরিমাণ কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি পায়, তাহলে তো এমনও হতে পারে যে, কয়েক হাজার বছর পরে, পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবে বিষধর ইঁদুর।  গবেষকদের মনে এমনও এক সম্ভাবনার কথা উঁকি দিয়ে গেছে।

সত্যিই, প্রকৃতিতে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।  লালা তৈরির গ্রন্থির একটু বদলে যাওয়ার ফলেই যখন বিষ তৈরির গ্রন্থি সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে, তখন মানুষও যে একদিন বিষধর হয়ে উঠবে না, তা কে বলতে পারে।তত্ত্বের দিক থেকে বিচার করলে, তা খুবই সম্ভব। সুদূর ভবিষ্যতে, পরিবেশের তাড়নায় মানুষকে যদি বিষধর হয়ে ওঠার প্রয়োজন দেখা হয়, তাহলে প্রকৃতি হয়ত তার ব্যবস্থা করে দেবে।

তরে সে তো সুদূর ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু সম্প্রতি আমাদের প্রজাতির নেতা নেত্রীদের ভাষণে যে পরিমাণ বিষাক্ত শব্দ-যৌগের ব্যবহার লক্ষ করা গেছে, তা থেকে এটা ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, আমাদের স্যালাইভা তৈরির গ্রন্থি না হলেও, কন্ঠ গ্রন্থি বিষ ছড়ানোর কাজে ইতিমধ্যেই বেশ কিছুটা সাফল্য অর্জন করেছে।  বাকিটা সময়ই বলবে। 


Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

প্রকৃতি তৈরি করছে প্লাস্টিকের পাথর

গাছেরা কি দেখতে পায়