কোভিড ১৯’র দ্বিতীয় হামলা
হাওয়ায়
ভাসছে নভেল করোনাভাইরাস। গত বছর, কোভিড-১৯ অতিমারি যখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছে, তখন এমনটাই
সন্দেহ করা হয়েছিল একবার। এই ধারণার পেছনে বেশ কিছু প্রমাণ থাকলেও, সেই সময় পুরোপুরি
নিশ্চিত হতে পারেননি গবেষক মহল। এখন আবার সেই কথাই নতুন করে বেশ জোর দিয়ে বলা হয়েছে
‘ল্যানসেট’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে। নভেল করোনাভাইরাস একজনের শরীর থেকে
বেরিয়ে, বাতাসে ভাসতে ভাসতে অন্য একজনের শরীরে প্রবেশ করতে পারে বলেই জানিয়েছেন গবেষকরা।
কিছুদিন হল, কোভিড-১৯’র সংক্রমণ ভারতে হু হু করে বাড়ছে। শীতের মরশুমে একটু শক্তিহীন হয়ে পড়লেও, বৈশাখের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎই যেন ঝড় তুলেছে কোভিড। তার পেছনে নভেল করোনার নিজের ক্যারামতি যেমন আছে, তেমনই আছে অবোধ মানুষের নিজস্ব অবদান।
নভেল করোনা তার ভোল পাল্টাচ্ছে বারবার। চিন থেকে নানা পথে নানা দেশে পৌঁছে, সেখানকার হালচাল বুঝে, সে নিজেকে একটু আদটু বদলে নিয়ে নিজের শক্তি বা দক্ষতা বাড়িয়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের যে স্ট্রেনটি এখন ভারতে তাণ্ডব চালাচ্ছে, সেটি নাকি সোজা উড়ে এসেছে ইংল্যাল্ড থেকে। তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে ব্রেজিল আর দক্ষিণ আফিকার স্ট্রেন। তেমনটাই জানা যাচ্ছে প্রকাশিত খবর থেকে।
ইংল্যান্ড
থেকে যেটি এসেছে, সেটি নভেল করোনাভাইরাস হলেও, তার যে বিশেষ ক্ষমতা আছে, তা জানা গিয়েছিল
তার আগমনের আগেই। বলা হয়ে ছিল, নভেল করোনাভাইরাসের এই বিলিতি স্ট্রেনটির সংক্রমণ ছড়ানোর
ক্ষমতা, সেই চিন দেশ থেকে আগত করোনার চেয়ে ঢের বেশি। আর এই নতুন স্ট্রেনটি অনেক বেশি ক্ষতিকরও বটে। লন্ডন
স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের মত হল, ওই স্ট্রেনটি ৪৩ থেকে ৯০ শতাংশ
দ্রুত হারে সংক্রমণ ছড়ায় আর ৫৫ শতাংশ বেশি প্রাণহানি ঘটাতে পারে। এ বছর ‘নেচার’ ও‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত তাঁদের গবেষণার ফলাফল থেকে এ কথা জানা গেছে।
তুলনায়, ব্রেজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার স্ট্রেনগুলি কতটা ক্ষমতাশালী তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে, মার্চ মাসে ভারতের মহারাষ্ট্রে পাওয়া গেছে নভেল করোনাভাইরাসের একটি ‘ডাবল মিউট্যান্ট’। অর্থাৎ, সেটি ইতিমধ্যেই দু’বার ভোল পাল্টেছে আর সেই সঙ্গে বাড়িয়েছে তার সংক্রমণ ঘটানোর ক্ষমতা।
তার
ওপর, অক্সফোর্ড ইউনিভারসিটির গবেষক তৃষা গ্রিনহল জোরের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, নভেল
করোনাভাইরাস কেবল হাঁচি-কাশির সঙ্গে বেরিয়ে আসা ড্রপলেট বা জলীয়কণার মধ্যে দিয়েই সংক্রমিত
হয়, এমনটা নয়। বরং ওই ভাইরাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে হাওয়ায় মিশে বেশ কিছু দূর ভেসে যেতে
পারে। আর তারই মধ্যে আশেপাশে থাকা অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ছড়ায়।
এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েনসেস-এর ডিরেক্টর
ডাঃ রণদীপ গুলেরিয়া ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছেন। একজন কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি
বা কাশির সঙ্গে করোনাভাইরাস সমেত যে জলীয়কণা নাক বা মুখ থেকে বেরিয়ে আসে সেগুলির আয়তন
৫ মাইক্রোনের চেয়ে বেশি। তাই বেশিক্ষণ হাওয়ায় ভেসে যেতে পারে না তারা। দু মিটার যেতে
না যেতেই, মাটিতে বা অন্য কোনও বস্তুর ওপর পড়ে যায়। অন্যদিকে, আক্রান্ত ব্যক্তির নিঃশ্বাসের
সঙ্গে যে জলীয় অণুকণা বা এয়ারোসল বেরিয়ে আসে, সেগুলির আয়তন ৫ মাইক্রোনের চেয়ে অনেক
কম। তাই সেগুলি বাতাসে অনেকক্ষণ ভেসে থাকে আর চলে যেতে পারে দু’মিটারের চেয়ে আরও দূরে।
গবেষক
গ্রিনহলের মতে, বিশ্বে যত কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঘটেছে, তার ৩৩ থেকে ৫৯ শতাংশ ঘটিয়েছে ওই
বাতাসে ভাসমান নভেল করোনাভাইরাস। তাই উনি বলেছেন, কোভিডকে ঠেকানোর জন্য ভাল মাস্ক
পরা, হাত স্যানিটাইজ করা, আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ছাড়া নিজেকে সুরক্ষিত রাখার
আর কোনও উপায় নেই। ভ্যাকসিন নেওয়া সত্ত্বেও, এই সাবধানতাগুলি মেনে চলতেই হবে। তাছাড়া
জোর দেওয়া হয়েছে খোলামেলা পরিবেশে থাকার ওপর। অর্থাৎ, হাওয়া চলাচল করে, এমন ঘরে থাকাটাই
তুলনায় বেশি নিরাপদ বলে মনে করেন তিনি।
অথচ, লকডাউন উঠে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, এই সাবধানতাগুলি উপেক্ষা করা হচ্ছে বারবার। হাটে-বাজারে বা বড় বড় জনসমাবেশে একে অপরের থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে না কেউ। তাছাড়া সেই সব সমাগমে, খুব কম মানুষকেই মাস্ক পরে থাকতে দেখা যায় আজকাল। দেশে যে কোভিড-১৯ নামের এক অতিমারি চলছে, তা যেন বেমালুম ভুলে গেছে সবাই।
ফলে,
সব সাবধানতাকে শিকেয় তুলে আমরা যতই তাইরে নাইরে না করে নেচে বেড়াব, ততই কোভিড অতিমারির
সুনামি সৃষ্টি করবে হাওয়ায় ভাসমান এক দ্বিগুণ ক্ষমতা সম্পন্ন নভেল করোনাভাইরাস। এবং
তার ভয়ঙ্কর মাশুলটা দিতে হবে কিন্তু আমাদেরই।

Comments
Post a Comment