কোভিড-১৯: বসন্ত বিভ্রাট
মার্চের শুরু থেকে কোভিড-১৯-এর সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করেছে। শীতের দিনগুলিতে এই অসুখে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছিল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলেন সবাই। কিন্তু কিছু দিন হল শীত বিদায় নিয়েছে।
এখন
বসন্ত। জীর্ণ পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে, গাছেরা সেজেছে নতুন পাতার সাজে। আর সেই সঙ্গে দেশজুড়ে
শক্তিহীন হয়ে আসা কোভিড-১৯ হঠাৎ যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে উষ্ণ হাওয়ার ছোঁয়ায়। তাহলে
কি ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের সঙ্গে অতিমারি কোভিড-১৯-এর পুনরুত্থানের একটা যোগ আছে?
হ্যাঁ,
খুব সুস্পষ্ট যোগ আছে বলেই মনে করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোম্বিয়া ইউনিভারসিটির
পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর লিউইস জিস্কা। এ বিষয়ে, ‘দ্য কনভারসেশন.কম’-এপ্রকাশিত তাঁর লেখায় উনি বলেছেন, বসন্ত মানেই উদ্ভিদ জগতে প্রাণের বিস্ফোরণ। এই সময়
ফুল ফোটে চারিদিকে। তাই বাতাসে খুব বেশি মাত্রায় ভেসে বেড়ায় ফুলের রেণু। আর সেই ভাসমান
রেণু, অনেকের শরীরে এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যেমন অ্যালার্জি।
তাঁর
আগের গবেষণায় উনি দেখেছিলেন যে, ফুলের রেণু মানুষের শরীরে এক বিশেষ প্রোটিনকে নিস্তেজ
করে দেয়। অথচ ওই প্রোটিনটির দায়িত্ব অনেক। কোনও ভাইরাস যদি আমাদের শ্বাসনালিতে সংক্রমণ
ঘটানোর চেষ্টা করে, ওই প্রোটিন বিপদ সংঙ্কেত পাঠায় শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্হার সদর
দফতরে। তারপর সেখান থেকে নির্দেশ যায় সেনা কোষদের কাছে। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় প্রতি
আক্রমণ। কিন্তু সেই প্রহরী প্রোটিনই যখন রেণুর
প্রভাবে কিছুটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন শরীরের পুরো প্রতিরোধ ব্যবস্থাটাই তার তৎপরতা
হারায়। ফলে, সাধারণ ঠান্ডা লাগার জীবাণু বা সার্স-এর মতো আরও মারমুখী ভাইরাস আমাদের
শ্বাসনালি আর ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম হয়।
কোভিড-১৯
অতিমারি শুরু হওয়ার পর তাঁরা আরও একটি গবেষণা করেন। এবার একমাত্র কোভিড-১৯-ই ছিল তাঁদের
গবেষণার বিষয়বস্তু। তাঁরা দেখতে চান যে, বাতাসে রেণুর পরিমাণ বাড়া কমার সঙ্গে, কোভিড-১৯
সংক্রমণও ওঠা নামা করে কিনা। তার জন্য সমীক্ষা চালানো হয় ৩১টি দেশে। দেখা যায়, কোভিড-১৯
সংক্রমণের ওঠা নামার যে হিসেব তাঁরা পান, তার ৪৪ শতাংশের সঙ্গেই বাতাসে ফুলের রেণুর
পরিমাণ কম বেশি হওয়ার একটা সরাসরি যোগ ছিল। আর সেই সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতা আর তাপমাত্রারও
একটা ভূমিকা দেখা যায়।
গবেষকরা দেখেন, যেখানে লকডাউন নেই, সেই সব জায়গায় বাতাসে রেণুর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার চার দিন পর থেকে সংক্রমণের হার প্রায় ৪% বেড়ে যায়। এও লক্ষ করা যায় যে, যে-সব ফুলের রেণু সাধরণত কোনও অ্যালার্জি সৃষ্টি করে না, বাতাসে সেগুলির প্রাদুর্ভাবও কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার বাড়িয়ে দেয়।
জেস্কি আরও লিখেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাতাসে ফুলের রেণু ভেসে বেড়ানর সময়টা অনেকটাই বেড়ে গেছে। পৃথিবীর নানা দিকে বসন্ত এখন খানিকটা আগেই এসে যাচ্ছে। লক্ষণীয় বিষয় হল, ভারতে কোভিড-১৯ অতিমারির আকার ধারণ করতে শুরু করে গত বসন্তে। আর শীতের মরসুমে কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসার পর, সে আবার জ্বলে উঠছে এই বসন্তে, রেণুর উৎসবে।।

Comments
Post a Comment