মাছে-ভাতে থাকার দিন কি শেষ হতে চলেছে

 


কথায় বলে মাছে ভাতে বাঙালি। কিন্তু বাঙালির কপালে সেই মাছে ভাতে থাকার সুখ আর কদিন জুটবে বলা মুশকিল। এবং ভবিষ্যতে না জোটার সম্ভাবনার বার্তা ইতিমধ্যেই রটেছে। কারণ সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট বলছে মিঠে জলের মাছেদের ৮০ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর তার মধ্যে ১৬ প্রজাতিই লুপ্ত হয়েছে গত এক বছরে। গবেষকরা সতর্ক করছেন এই বলে যে, মিঠে জলের মাছের এক তৃতীয়াংশই এখন হুমকির মুখে।

আর বাঙালির নির্ভরতাও তো সেই রুই-কাতলা-ট্যাঙরা-পাবদা-কই-পার্শে-ভেকটি ইত্যাদি মিঠে জলের মাছের ওপর। আর শুধু খাদ্য বা রসণাতৃপ্তির জন্যই নয়। জীবিকার কারণেও তো লক্ষ লক্ষ মানুষ এর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নদীতে বিপুল দূষণ তাকে প্রায় নর্দমায় পরিণত করেছে। এবং কয়েক কোটি মানুষের চাহিদা মেটাতে নির্বিচারে মাছ ধরা, ও জলাভূমি নষ্ট করায় নিত্য মাছের সংখ্যা কমছে।

তার ওপর নদীতে যথেচ্ছ বাঁধ দেওয়ার ফল পরিযায়ী মাছেদের স্বাভাবিক চলাফেরায় বাধা সৃষ্টি হয়েছে। তাতেই দেখা যাচ্ছে বিগত ৫০ বছরে ওই মাছের সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ কমে গেছে। এবং ওই সময় কালের মধ্যে ‘মেগা ফিশ’ বা বড় জাতের মাছেরা কমেছে ৯৪%। সেদিক থেকে মাছেদের জগতে যেন একটা বড় বিপর্যই নেমে এসেছে।

সবজির বাজারে যেমন দেশি বরবটি, দেশি টমেটো বা দেশি শশা খুঁজে পেতে প্রায় কালঘাম ছুটে যায়। তেমনি মাছেদের বাজারেও দেশি পুঁটি, বেলে, ট্যাংরা ইত্যাদি মাছেরা প্রায় উধাও।

ডবলিউ ডবলিউ এফ, লন্ডন জুলজিকাল সোসাইটি, গ্লোবাল ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সহ ১৬ টি সংরক্ষণবাদী সংস্থার ওই রিপোর্ট থেকে আরও উঠে এসেছে যে, শুধু এশিয়াতেই নয়, ইউরোপের বহু মাছই লুপ্ত প্রায়। যেমন ইংল্যান্ডে স্টারজন, বার্বট ইত্যাদি মাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সামন মাছও অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। চরম বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইউরোপিয়ান ইলও।

বাংলাদেশেও ৬৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। সরপুঁটি, ট্যাংরা, মহাশোল, পাঙাশ, চিতল ইত্যাদি মাছও সেখানে হুমকির মুখে। এবং বাংলাদেশে উপকুল অঞ্চলে নির্বিচারে অতিরিক্ত মাছ ধরে ফেলায় সেখানে ‘ফিশলেস জোন’ তৈরি হতে চলেছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

বঙ্গোপসাগরে মাছের ভাঁড়ারটি কেমন তাই নিয়ে একটি গবেষণা রিপোর্ট বলছে যে, বেশির ভাগ মাছের সংখ্যাই কমছে, যার কিছু বিলুপ্তির দরজায় পৌঁছে গেছে।

 থাইল্যান্ডের সমুদ্রের মতো পৃথিবীর বেশ কিছু সাগরের মাছের ভাঁড়ারটি ক্রমশই ফুরিয়ে আসছে। মাছ ধরার কাজে বড় বড় ট্রলারের যথেচ্ছ ব্যবহার নানা প্রজাতির অসংখ্য মাছের চারা ধ্বংস করে ফেলে।

অথচ বাংলাদেশের ১.৫ মিলিয়ন লোকের মাছ ধরাই জীবিকা। এবং পৃথিবীর অন্যতম জন ঘনত্বের দেশ বাংলাদেশের মানুষের প্রধান প্রোটিন চাহিদা মেটে ওই মাছ থেকেই। সরকারি উদ্যোগে তৈরি গত তিন বছরের সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে বাংলাদেশের খুবই দামি ও বৃহত্তম টাইগার প্রন ও ভারতীয় স্যামন মাছ সেখান থেকে প্রায় নিশ্চিহ্নই হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় ৩৫ বছর মাছ ধরছেন জসিম। তিনি বিবিসি’কে জানান যে, “কয়েক বছর আগেও ঘন্টা দুয়েক মাছ ধরলেই বিক্রির মতো মাছ জুটে যেত। আর এখন সঙ্গীদের নিয়ে ২০ ঘন্টা চেষ্টা চালিয়েও মাছ জোটে না। আর আগে যেসব মাছ আমরা ধরতাম, এখন তাদের আর দেখতেই পাই না।”

ডবলিউ ডবলিউ এফ বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে, মিঠে জলের মাছের বসতি এলাকার স্বাস্থ্য ফেরাতে আইনের প্রয়োগ সুনিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে পরিবেশ বিলকে আরও শক্তিশালী করার। জরুরি দূষণ ভারাক্রান্ত নদীগুলিকে পরিষ্কার করে, মিষ্টি জলের উৎসগুলিরও সঠিক সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে তারা।

মৎস্যজীবীরা বিপর্যয়ের আভাস পাচ্ছেন। কারণ তাঁদের রুজিতে টান পড়ছে। তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই বলছে, আগামী দিনে মাছের ঘোরতর সঙ্কট দেখা যাবে।

মালবী গুপ্ত 

সূত্র: বিবিসি.কম 

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

প্রকৃতি তৈরি করছে প্লাস্টিকের পাথর

গাছেরা কি দেখতে পায়