কোথায় গেল মঙ্গলের মহাসাগর

 


পৃথিবী থেকে ২0.৪ কোটি কিলোমিটার দূরে, মঙ্গলের মাটিতে এখন ঘুরছে মানুষের পাঠানো একটি গাড়ি। নাম ‘পারসিভিয়ারেন্স’। শব্দটির মানে, লেগে থাকা। চেষ্টা করে যাওয়া। ‘হাল ছেড় না, বন্ধু’ - এই বলে নিজেকে উৎসাহ দিয়ে যাওয়ার আর এক নাম পারসিভিয়ারেন্স।

শুনসান মঙ্গলে একা একা ঘুরছে পৃথিবী থেকে পাঠানো সেই গবেষণা যান। তার কোনও চালক নেই। তবুও সেটা চলে। এখান থেকে প্রেরিত সংকেতই সেটিকে চালায়। ২০.৪ কোটি কিমি দূর থেকে সঙ্কেত গেলে, সেই যান চলতে শুরু করে। তার টিভি ক্যামেরার চোখ খুলে যায়। শব্দগ্রহণ যন্ত্রের কান খাড়া হয়ে ওঠে। মঙ্গলের মাটিতে সেই গাড়ি এখন ঘুরছে আর ওই গ্রহের মাটিতে রেখে চলেছে তার চাকার দাগ।

পারসিভিয়ারেন্স-এর আগেও সেখানে পাঠানো হয়েছে গবেষণা যান। মঙ্গলের অন্যদিকে সেগুলি এখনও সচল আছে। কাজ করছে। তথ্য পাঠিয়ে চলেছে। কিন্তু পারসিভিয়ারেন্সের ক্ষমতা তাদের তুলনায় কিছু বেশি। তার কাছ থেকে ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে মঙ্গলের বেশ কিছু ছবি। মনে হবে আমরা যেন পৃথিবীরই একটা লালচে সংস্করণের ছবি দেখছি। উঁচু নীচু ঢেউ খেলানো, রুক্ষ জমি। ছোট বড় পাথর ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। দূরে, দিগন্ত জুড়ে প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের সারি। তারই পেছনে লাল আভা ছড়িয়ে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। পারসিভিয়ারেন্স-এর সৌজন্যে মঙ্গলের বাতাসের শব্দ আমরা শুনতে পেয়েছি ইতিমধ্যেই। দেখতে পেয়েছি, কুণ্ডলী পাকিয়ে ধেয়ে আসা ধুলোর ঘূর্ণীর ছবি। কিন্তু সেখানে কোনও তৃণ নেই। গাছ নেই। কোনও প্রাণের আভাস পাওয়া যায়নি এখনও। আর সেই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র নাসা পারসিভিয়ারেন্স-কে সেখানে পাঠিয়েছে। অনেক কাজের মধ্যে তার একটা বড় কাজ হল, মঙ্গলের বুকে প্রাণের সন্ধান করা। আছে কি কেউ সেখানে?

অনেক কাল আগে মঙ্গলে জল ছিল। ছিল জলাশয় আর প্রবাহমান নদী। শুধু তাই নয়, অতলান্ত মহাসাগরের থেকে খানিকটা ছোট সমুদ্রও ছিল বলে মনে করা হয়। তবে সে সব ছিল অনেক কাল আগে। তা নয় নয় করে, প্রায় ৪০০ কোটি বছর তো হবেই। গবেষকদের মতে, সেই সময়, মঙ্গলও ছিল পৃথিবীর মতই নীল। তারপর, ১০০ কোটি বছরের মধ্যে, বা আজ থেকে ৩০০ কোটি বছর আগে, উধাও হয়ে গেল মঙ্গলের সব জল। কেন, কি করে, কোথায়? এ সব প্রশ্নের কোনও সঠিক উত্তর মেলেনি এখনও।

একটা মত হল, মঙ্গলের দুর্বল মাধ্যাকর্ষণের ফলে, সব জল একটু একটু করে মহাকাশে মিলিয়ে যায়। ফলে জলশূন্য হয়ে যায় মঙ্গল। তবে এই তত্ত্ব মানছেন না কোনও কোনও বিজ্ঞানী। তাঁরা বলছেন, ওই ভাবে কিছুটা জল মিলিয়ে যেতে পারে ঠিকই। কিন্তু সব জল? সেটা হওয়া অসম্ভব বলেই মনে করেন তাঁরা। তা হলে জল গেল কোথায়? ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, অনেকটা জল সঞ্চিত আছে মঙ্গলের মাটিতে। সেই জল শুষে নিয়েছে মঙ্গলের ধূলিকণা, খনিজ পদার্থ, পাথরের চাঁই। বিজ্ঞানের পরিভাষায় ওই সব বস্তুকে বলা হয় ‘হাইড্রেট’। তাদের মধ্যে জল থাকে। তবে তরল জলের আকারে নয়। অক্সিজেন আর হাইড্রোজেনের রূপে। মঙ্গলে ভূপৃষ্ঠে আর ভূগর্ভে ওই হাইড্রেট গোষ্ঠীর পদার্থ নাকি রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। কিন্ত সেগুলি থেকে কি আবার জল ঝরে পড়বে কোনও দিন? তার কোনও সম্ভাবনা এখনও দেখছেন না বিজ্ঞানীরা।

জল যে এক সময় ছিল, এবং এখনও আছে, তার ভুরি ভুরি ইঙ্গিত তো মিলেছে। মঙ্গলের মেরু অঞ্চলে হাল্কা বরফের চাদরের উপস্থিতির কথা জানা গেছে। তাছাড়া, ‘নেচার অ্যাস্ট্রনমি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, মঙ্গলের মাটির নীচে মিলেছেনোনা জলের তিন তিনটে বড় জলাশয়ের সন্ধান। তাহলে কি সেখানে প্রাণ আছে? প্রশ্নটা জোরদার হচ্ছে। বিজ্ঞানী মহলে এই নিয়ে এখন বিতর্ক চলছে। সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে। উপগ্রহ থেকে পাওয়া নানান তথ্য বিশ্লেষণ করে যাকে ভূগর্ভে সঞ্চিত জল বলে মনে করা হচ্ছে, তা কি সত্যিই জল? নাকি অন্য কিছু? এই প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।

এই বিতর্কের নিষ্পত্তি হতে আরও কিছু সময় লাগবে। কিন্তু এই নতুন আবিষ্কার যে বিজ্ঞানী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস