কাশ্মীরের বন্যদের বন্ধু আলিয়া মীর

আলিয়া মীর; ছবি: পোস্টকার্ড কাশ্মীর

বন্যপ্রাণীরা মাঝে মাঝেই লোকালয়ে চলে আসছে। শুধু লোকালয় বললে কম বলা হয়। তারা চলে আসছে একেবারে শহরের মধ্যে। তেমন ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটছে কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরে। গত ডিসেম্বর মাসে, একটি লেপার্ড বা চিতাবাঘ এসে পড়েছিল সেখানে। তাকে শহরে ঘুরে বেড়াতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন লোকজন। দল বেঁধে সেটিকে মারতে কোমর বেঁধে নামেন অনেকে। তার ফলে ভয় পেয়ে, প্রাণ বাঁচাতে নানা দিকে ছুটে বেড়ায় চিতাবাঘটি। কিন্তু তার কপাল ভাল যে, সময় মতো খবর পান আলিয়া মীর। বনকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে, চিতাবাঘটিকে নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচান আলিয়া।

অঙ্কশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন শ্রীনগরের ওই মহিলা। কিন্তু প্রাণীদের প্রতি ভালবাসা তাঁকে করে তুলেছে একজন প্রথম সারির পশু উদ্ধারকারী। একদিন একটা প্যাঁচা বেকাদায় আটকে গিয়ে ছিল শ্রীনগরের এক চিনার গাছে। তাকে বাঁচাতে মই ঘাড়ে করে দৌড়ে ছিলেন আলিয়া। প্রাণী উদ্ধার কজে সেটাই তাঁর হাতেখড়ি বলা যায়।

প্যাঁচা উদ্ধারের কাজটা তো এক রকম ছিল। কিন্তু একটা বড়, বিশেষ করে ভয়-পাওয়া, চিতাবাঘকে বাগে আনার কাজটা যে আরও বহু গুণ কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে ডিসেম্বরের শীতে যখন চারিদিক ছিল বরফে ঢাকা। পেঁজা তুলোর মত তুষারের ওপর তার পায়ের ছাপ দেখে দেখে খুঁজে বেড়াতে হয় চিতাবাঘটিকে।সকলকে ধৈর্য আর সাহসের এক বড়সড় পরীক্ষা দিতে হয় । বিপদ তো ঘটতেই পারত যে কোনও সময়। যদি সেটি আক্রমণ করে বসত কোনও শহরবাসীকে? তাহলে তো নির্ঘাত ভেস্তে যেত উদ্ধার কাজ। তবে আলিয়া ও তাঁর দল শেষ পর্যন্ত বাগে আনতে পেরেছিলেন চিতাবাঘটিকে। তাকে আবার ছেড়ে দেওয়া হয় দূরের জঙ্গলে।

এমনি করে পথহারা প্রাণীদের উদ্ধার কাজেই ব্যস্ত থাকেন আলিয়া। খবর পেলেই ছুটে যান। এ পর্যন্ত তিনি বেশ কয়েক ডজন প্রাণীকে উদ্ধার করেছেন। তাদের মধ্যে আছে সাপ, পাখি, ভালুক আর লেপার্ড।

কয়েক বছর আগে, দু’টি ভালুকের ছানা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে ছিল তাদের মায়ের কাছ থেকে। এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে ওই দুই মা-হারা শিশু আশ্রয় নিয়েছিল শ্রীনগর চিড়িয়াখানার এক কোণে। খবর পৌঁছয় আলিয়ার কাছে। উনি ও তাঁর সহকর্মিরা, তাদের মাকে খুঁজে বার করার অনেক চেষ্টা করেন। বাচ্চা দু’টির ডাক রেকর্ড করে খুব জোরে বাজাতে থাকেন জঙ্গলের চারপাশে। যদি সেই ডাক শুনে মা ভালুক বেরিয়ে আসে তার ছানাদের খোঁজে। না, কেউ আসেনি সেই ডাক শুনে। কী হয়েছিল মা ভালুকের, সে খবরও দিতে পারেনি কেউ। সেই থেকে মায়ের ভূমিকা পালন করেন আলিয়া নিজেই। পরম স্নেহে, খাইয়ে-দাইয়ে, বড় করে তোলেন সেই দুই ভালুক ছানাকে।

পড়াশোনা করেছিলেন অঙ্ক নিয়ে। শ্রীনগরের এক নামী স্কুলে পড়িয়েও ছিলেন কিছু দিন। কিন্তু সে সব ছেড়ে পশু পাখিদের সেবায় নেমে পড়েছিলেন এক সময়। বিয়ে করেন এক পশু চিকিৎসককে। আলিয়া বলেছেন, তাঁর ও তাঁর স্বামীর মন যেন একই সূত্রে বাঁধা। প্রাণীদের বাঁচানোই তাঁদের জীবনের ব্রত। অস্থির কাশ্মীরে বন্যপ্রাণীদের অবস্থাটা কী রকম? আলিয়ার মতে, পরিস্থিতিটা ভাল নয়। তবে হতাশাজনক, তেমনটাও বলা যাবে না। উনি দেখছেন, মানুষজনের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। বিশেষ করে, তরুণ প্রজন্ম প্রাণীদের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল।

অবশ্য অনেকটা পথ হাঁটতে হবে এখনও। অঙ্কের দিদিমনি হিসেব করে তেমনটাই দেখেছেন।

মঙ্গাবে-তে একটি সরকারি হিসেব প্রকাশ করা হয়েছে। তা থেকে আসা বন্য প্রাণীদের অবস্থার একটা ছবি ফুটে উঠছে। হিসেবটা ২০১২ থেকে ২০২০-র। ওই আট বছরে প্রাকৃতিক কারণে বা মানুষের হাতে মারা গেছে ৪৪ চিতাবাঘ ও ১২৪ টি কালো ভালুক। তবে এদের মধ্যে মানুষের হাতে ক’টি প্রাণ হারিয়েছে, সেই হিসেবটা আলাদা করে দেওয়া হয়নি। আর ২০১৬ থেকে ২০২০-র মধ্যে, অর্থাৎ ১৪ বছরে বন্য প্রাণীর আক্রমণে ২৪২ জন মানুষ প্রাণ হারান। জখম হন ৩,৫২৮। বলা হচ্ছে শীতের সময়, জঙ্গলে খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। আর সেই সময়ই শিকারি প্রাণীরা খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। এবং তখনই মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে।

Comments

Popular posts from this blog

জল - চাহিদা বড়ছে, যোগান কমছে

গাছেরা কি দেখতে পায়

এক চিলতে বাগানে হাজারও প্রাণীর বাস