দুধে গোলা প্লাস্টিক খাচ্ছে শিশুরা
মানুষ অনেক কিছু পারে। যেমন, পৃথিবীকে সে প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে ফেলছে প্রায়। সর্বত্র ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিকের ছোটবড় টুকর। তা সে হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গেই হোক বা সমুদ্রের গভীরে বা মেরু অঞ্চলের জমাট বরফে। মানুষ আবার অনেক কিছু এখনও পারে না। যেমন, পৃথিবীকে কী ভাবে প্লাস্টিকমুক্ত করা যায়, তা জানা নেই তার। কিম্বা বলা উচিৎ, উপায়টা জানা থাকলেও, সে পথে হাঁটতে চায় না কেউ। যেমন, সাধারণ বুদ্ধিতে তো মনে হয়, প্লাস্টিকের উৎপাদন যদি আজই বন্ধ করে দেওয়া যায়, তা হলে তো কাল থেকেই পৃথিবীর বুকে প্লাস্টিকের বোঝা আর বাড়ে না। কিন্তু অসাধারণ বুদ্ধি হয়তো বলে, এই সমস্যা সমাধানের এটা কোনও পথই নয়। তাই প্লাস্টিকের উৎপাদন থামছে না। আর সারা পৃথিবী ঢেকে যাচ্ছে প্লাস্টিকে।
এমনকি
প্লাস্টিক আমাদের শরীরেও ঢুকছে। আমরা গরু ছাগলের মত প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ চিবিয়ে
খাই না ঠিকই, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্লাস্টিক আমাদের অজান্তেই আমদের শরীরে প্রবেশ করছে।
এমনকি শিশুদের শরীরেও।
সম্প্রতি
জানা গেছে যে, যে সব প্লাস্টিকের বোতলে শিশুদের দুধ খাওয়ানো হয়, সেই দুধের বোতল
থেকে লক্ষ লক্ষ প্লাস্টিকের অনুকণা দুধের সঙ্গে মিশে তাদের শরীরে ঢোকে। ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’-এ প্রকাশিত একটি লেখায় বলা হয়েছে
যে, প্রতি এক লিটার দুধের সঙ্গে প্লাস্টিকের ৪০ লক্ষ অনুকণা প্রবেশ করে একটি শিশুর
শরীরে। তবে তার ফলে, শিশুদের কোনও ক্ষতি হয় কিনা, তা জানা যায়নি বলে লেখা হয়েছে ওই
প্রতিবেদনে।
আয়ারল্যান্ডের
ডাবিলিন শহরের ট্রিনিটি কলেজের গবেষক জন বোল্যান্ড ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেছেন যে, পলিপ্রপলিন
দিয়ে তৈরি বোতলে দুধ গোলার সময়, ওই পরিমাণ অনুপ্লাস্টিক দুধের সঙ্গে মিশে যায়। এবং
সেই দুধের সঙ্গে তা বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করে।
গবেষণা
থেকে পাওয়া এই তথ্য অবাক করেছে বিজ্ঞানীদের।
বোল্যান্ড বলেছেন, তাঁরা জানতেন যে প্লাস্টিকের বোতল থেকে অনুকণা ঝরে পড়ে।
কিন্তু আসল পরিমাণটা দেখে তাঁরা যে বিস্মিত হয়েছেন, সে কথা বোল্যান্ড নিজেই স্বীকার
করেছেন।
ওই
লেখাটিতে হেদার লেসলি নামের নেদারল্যান্ডের এক গবেষকের কথা উদ্ধৃত করেও বলা হয়েছে যে,
মানুষের শরীরের পক্ষে কতটা অনুপ্লাস্টিক সহনশীল, তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। তিনি অ্যামস্টারড্যামের
‘ভিইউ’ নামে পরিচিত ইউনিভারসিটির সঙ্গে যুক্ত আছেন।
চায়ে প্লাস্টিক
চায়ে
চুমুক দেওয়ার আগে খেয়াল করুন, আপনি কোনও প্লাস্টিক টি-ব্যাগ ব্যবহার করেছেন কিনা।
তা হলে, প্রতি চুমুকে আপনি হয়ত চায়ের সঙ্গে কিছুটা প্লাস্টিকও পান করছেন।
চায়ের
জল যদি ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম হয়, আর তাতে যদি ডোবান হয় প্লাস্টিকের টি-ব্যাগ, তা
হলে আনুমানিক ১১৬ বিলিয়ন বা ১১৬০ কোটি প্লাস্টিকের অনুকণা ছড়িয়ে পড়ে চায়ের কাপে। এমনটাই
জানা গেছে কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভারসিটির এক গবেষণা থেকে।
এর
ফলে, মানুষের কি কোনও ক্ষতি হচ্ছে? এ বিষয়ে এখনও কিছু জানা যায়নি। তবে গবেষক নিথালি
টুফেঙ্কজি বলেছেন যে, জলে ওই পরিমাণ প্লাস্টিকের অনুকণা এক ধরনের পোকার মধ্যে অস্বাভাবিক
আচরণ সৃষ্টি করতে দেখা গেছে। আর সেই সঙ্গে তাদের শরীরের গঠনেও কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।
‘নিউ
সায়েন্টিস্ট’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে গবেষণা পত্রটি। তাতে টুফেঙ্কজি প্লাস্টিকের টি-ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ
করার অনুরোধ করেছেন সকলকে। বলেছেন, এমন টি-ব্যাগ ব্যবহার করাই ভাল যাতে কোনও প্লাস্টিক
নেই। আর সবচেয়ে নিরাপদ হল চায়ের খোলা পাতা ভিজিয়ে চা তৈরি করা।
পোশাক থেকে প্লাস্টিক
সম্প্রতি
আরও জানা গেছে যে, পোশাক থেকেও প্লাস্টিক
বা
প্লাস্টিকের অনুকণায় ভরে যাচ্ছে বিশ্বের সমুদ্রগুলি। সেই অনুকণা নানা প্রাণীর শরীরে
ঢুকছে। তাদের অনেকই আবার মানুষের খাদ্য। তাই এক প্লেট সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার সময় খানিকটা
প্লাস্টিকও আমরা খেয়ে ফেলছি। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, যে পরিমাণ প্লাস্টিক অনুকণা সমুদ্রে
মিশছে, তার একটা বড় অংশ আসছে আমাদের পোশাক থেকে।
‘সায়েন্স
অ্যালার্ট’-এ প্রকাশিত একটি লেখা থেকে জানা যাচ্ছে যে, কানাডার ‘ওশান ওয়াইজ কনজারভেশন
অ্যাসোসিয়েশন’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, আর্কটিক মহাসাগরের প্রতি এক ঘন মিটার জলে
৪০ টি প্লাস্টিকের অনুকণা পাওয়া গেছে। আর তার সিংহ ভাগটাই আসছে আমাদের জামাকাপড়ের পলিয়েস্টার
থেকে। বলা হচ্ছে, পলিয়েস্টার মেশানো কাপড় একবার কাচা হলেই, তা থেকে কয়েক লক্ষ প্লাস্টিকের
অনুকণা ছিটকে বেরয়। এবং তা নর্দমার জল থেকে খালে, খাল থেকে নদীতে, আর নদী থেকে সমুদ্রে
গিয়ে পড়ে।
এক
সময় মানুষের পোশাক তুলোর সুতো দিয়েই তৈরি হত।
কিন্তু ১৯৫০-এর দশক থেকে কাপড় তৈরিতে নাইলন আর পলিয়েস্টাররের সুতো ব্যবহার
শুরু হয়। সেই থেকে টেরিলিন ও টেরিকট কাপড়ের
ব্যবহার দিন দিন বেড়েছে। আর সেই সব কাপড়ের
পোশাক যত বারই কাচা হয়েছে, তত বারই লক্ষ লক্ষ প্লাস্টিকের অনুকণা জলে মিশেছে।

Comments
Post a Comment